এস আলমের বৈশ্বিক সম্পদে তদন্তের জাল: সাইপ্রাসে সম্পত্তি ক্রোক, সিঙ্গাপুরে অনুসন্ধান, এবার নজরে কুয়ালালামপুরের দুই বিলাসবহুল হোটেল
প্রকাশিত হয়েছে : ১৬ জুন ২০২৬, ৭:৫০:০৯ অপরাহ্ন
আহমাদুল কবির, কুয়ালালামপুর : বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত সিঙ্গাপুরের ব্যবসায়ী মোহাম্মদ সাইফুল আলম (এস আলম)-এর চারপাশের আইনি বেড়াজাল ক্রমশ সংকীর্ণ হয়ে আসছে| সাইপ্রাসে তার সম্পত্তি ক্রোক ও সিঙ্গাপুরে সম্পদ অনুসন্ধানের ধারাবাহিকতায় এবার নজর পড়েছে কুয়ালালামপুরের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত এস আলম গ্রুপের সঙ্গে সম্পৃক্ত দুটি নামী হোটেলের ওপর| সম্প্রতি এমন প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে মালয়েশিয়ার প্রভাবশালী সাপ্তাহিক সংবাদপত্র দ্য এজ মালয়েশিয়া| চট্টগ্রাম থেকে ভূমধ্যসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত এস আলমের বিলিয়ন ডলারের ব্যবসায়িক সাম্রাজ্যের ভিত্তি অর্থপাচারের মাধ্যমে গড়ে উঠেছে-বাংলাদেশি কর্তৃপক্ষের অভিযোগ এমনই|
প্রতিবেদনে বলা হয়, গত মে মাসে মাত্র দুই সপ্তাহের ব্যবধানে সাইপ্রাসে তার ও তার স্ত্রীর মালিকানাধীন একটি বিলাসবহুল আবাসিক সম্পত্তি ক্রোক করা হয়| একই সময়ে বাংলাদেশের একটি আদালত তার অনুপস্থিতিতে পাঁচ মাসের কারাদণ্ড দেন| অন্যদিকে সিঙ্গাপুরে এক বিলিয়ন মার্কিন ডলারেরও বেশি মূল্যের সম্পদের ওপর অনুসন্ধান চালাচ্ছে দেশটির তদন্তকারী সংস্থাগুলো|
কুয়ালালামপুরের প্রাণকেন্দ্র জালান সুলতান ইসমাইল ও জালান আমপাংয়ের সংযোগস্থলে অবস্থিত ‘রেনেসাঁ কুয়ালালামপুর হোটেল অ্যান্ড কনভেনশন সেন্টার’ এবং ‘ফোর পয়েন্টস বাই শেরাটন কুয়ালালামপুর সিটি সেন্টার’ এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে|
একই জমির ওপর নির্মিত এই দুটি হোটেলের মালিকানা রয়েছে ভেঞ্চুরা ইন্টারন্যাশনাল এসডিএন বিএইচডি’র হাতে, যা এস আলম গ্রুপের সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে জানা গেছে| ২০১৬ সালে তৎকালীন আইজিবি কর্পোরেশন ৭৬৫ মিলিয়ন রিঙ্গিতে হোটেলটি ভেঞ্চুরা ইন্টারন্যাশনালের কাছে বিক্রি করে|
ভেঞ্চুরা ইন্টারন্যাশনালের মালিকানা অনুসন্ধানে উঠে এসেছে একাধিক মালয়েশিয়ান ও সিঙ্গাপুরভিত্তিক হোল্ডিং কোম্পানির নাম| এর মধ্যে রয়েছে ওয়াইআইএফ হোল্ডিং মালয়েশিয়া, ওয়াইআইএফ হোল্ডিং প্রাইভেট লিমিটেড এবং হিলড্রিক্স এশিয়া গ্রোথ ফান্ড|
ব্যবসায়িক নথিপত্রে দেখা যায়, এসব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সিঙ্গাপুরের বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান হিলড্রিক্স ক্যাপিটালের সম্পৃক্ততা রয়েছে| প্রতিষ্ঠানটি সম্প্রতি মালয়েশিয়ার জিআইআইবি হোল্ডিংস এবং সিঙ্গাপুরের এমএম২ এশিয়াসহ বেশ কয়েকটি আলোচিত প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ করেছে|
মালয়েশিয়ার কর্তৃপক্ষ এখন পর্যন্ত হোটেল দুটির বিরুদ্ধে কোনো আইনি ব্যবস্থা নেয়নি| তবে আন্তর্জাতিক তদন্তের বিস্তৃতি এবং বাংলাদেশ সরকারের ˆবদেশিক সম্পদ উদ্ধারের প্রচেষ্টার কারণে ভবিষ্যতে মালয়েশিয়ায় থাকা এস আলম-সংশ্লিষ্ট সম্পদও তদন্তের আওতায় আসতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে|
ঘটনাপ্রবাহের মধ্যেই বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার প্রথম বিদেশ সফরের জন্য মালয়েশিয়াকে বেছে নিয়েছেন| আগামী ২১ ও ২২ জুন কুয়ালালামপুরে অনুষ্ঠিতব্য সফরে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের সঙ্গে তার দ্বিপাক্ষিক ˆবঠক হওয়ার কথা রয়েছে| কূটনৈতিক সূত্র বলছে, অভিবাসন, শ্রমবাজার, বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও শিক্ষা সহযোগিতা হবে আলোচনার প্রধান বিষয়|
সফরের অন্যতম অগ্রাধিকার হচ্ছে বাংলাদেশি শ্রমিকদের জন্য মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুনরায় চালু করা|
পর্যবেক্ষকদের মতে, মালয়েশিয়ায় এস আলমের সম্পদের ওপর আন্তর্জাতিক নজরদারি বৃদ্ধি এবং বাংলাদেশি শ্রমবাজার পুনরায় চালুর উদ্যোগ দুই বিষয়ই এখন বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া সম্পর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করছে|
আসন্ন দ্বিপাক্ষিক আলোচনায় অর্থপাচার, সম্পদ পুনরুদ্ধার কিংবা শ্রমবাজার সংস্কার কতটা গুরুত্ব পাবে, তা সময়ই বলে দেবে| তবে এটুকু স্পষ্ট, কুয়ালালামপুরের দুই বিলাসবহুল হোটেল এবং বাংলাদেশি শ্রমবাজার দুই ইস্যুই এখন আঞ্চলিক কূটনীতি ও অর্থনৈতিক আলোচনার নতুন কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে|




