কৃষিপণ্য নিয়ে কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ
প্রকাশিত হয়েছে : ১৬ জুন ২০২৬, ৯:০১:৩৬ অপরাহ্ন
সম্প্রতি কৃষিমন্ত্রী বলেছেন, সরকার ২ হাজার মিনি কোল্ড স্টোরেজ স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে। তিনি বলেন, কৃষকের উৎপাদিত পণ্যের সংরক্ষণ সক্ষমতা বৃদ্ধি ও ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে সরকার এক থেকে দুই বছরের মধ্যে সারাদেশে দুই হাজার মিনি কোল্ড স্টোরেজ স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে। তিনি আরো বলেন, দেশের প্রায় ৭০ থেকে ৭৫ শতাংশ মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কৃষির সঙ্গে সম্পৃক্ত। সামগ্রিক অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে কৃষিকে শক্তিশালী করতে হবে। সে লক্ষ্যে সরকার বাস্তবমুখী নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। কৃষকরা উৎপাদন করলেও অনেক ক্ষেত্রে সংরক্ষণ সুবিধার অভাবে ন্যায্যমূল্য পান না। বিশেষ করে সবজি ও পচনশীল কৃষি পণ্যের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত উৎপাদনের কারণে মৌসুমে দাম কমে যায়। এ সমস্যা সমাধানে কৃষকদের দোরগোড়ায় সংরক্ষণ সুবিধা পৌঁছে দিতে মিনি কোল্ড স্টোরেজ স্থাপন করা হবে। তিনি জানান, ১৫ থেকে ২০ জুন কৃষককে নিয়ে সমবায়ভিত্তিক ব্যবস্থাপনায় এসব কোল্ড স্টোরেজ পরিচালিত হবে এবং এগুলো সৌরবিদ্যুৎ চালিত হবে। ইতোমধ্যে পাইলট প্রকল্পে এ ব্যাপারে সফলতা পাওয়া গেছে। ২ হাজার মিনি কোল্ড স্টোরেজ স্থাপন করা গেলে প্রায় ৪০ হাজার কৃষক সরাসরি এর সুবিধা পাবেন।
জানা গেছে, কৃষিপণ্যের উৎপাদন ও বাজার চাহিদার সমন্বয় গড়ে তুলতে সরকার ডাটাবেসভিত্তিক পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। এতে কৃষকরা চাহিদা অনুযায়ী উৎপাদন করতে পারবেন এবং ভোক্তারাও সারা বছর তুলনামূলক স্থিতিশীল দামে কৃষিপণ্য পাবেন। সরকার পেঁয়াজ, পেঁয়াজ বীজ ও আদা উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের লক্ষ্যেও কাজ করছে। আগামী এক থেকে দেড় বছরের মধ্যে দেশে পেঁয়াজ আমদানির প্রয়োজন হবে না। আর তিন বছরের মধ্যে পেঁয়াজবীজ ও আদা উৎপাদনেও স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন সম্ভব হবে। কৃষিতে ডিজেল ও বিদ্যুতের ব্যবহার কমাতে সৌরশক্তিনির্ভর সেচ ব্যবস্থা সম্প্রসারণ করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে কয়েক হাজার সেচযন্ত্র সৌরশক্তিচালিত ব্যবস্থায় রূপান্তর করা হয়েছে। এছাড়া বিশ^ব্যাংকসহ উন্নয়ন সহযোগীদের সহযোগিতায় কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে।
বলা বাহুল্য, বাংলাদেশকে যে দু’টি প্রধান টিকিয়ে রেখেছে, এর একটি হচ্ছে রেমিট্যান্স এবং অপরটি কৃষি। অতএব, বাংলাদেশের অর্থনীতির অস্তিত্ব গতিশীলতা কৃষির ওপর কতোটুকু নির্ভরশীল, তা যে কোন সচেতন মানুষের জানা। কৃষিমন্ত্রী মিনি কোল্ড স্টোরেজ স্থাপনের কথা বলেছেন, এটা অত্যন্ত জরুরী একটি বিষয়। দীর্ঘদিন যাবৎ এই দাবি জানিয়ে আসছেন কৃষক ও উৎপাদকেরা। এখানে আরেকটি বিষয় উল্লেখ করা প্রয়োজন। সেটা হচ্ছে, কৃষিপণ্য বিশেষভাবে ফলমূল প্রক্রিয়াকরণ শিল্প। বলা বাহুল্য, এবার দেশে লিচুর বাম্পার ফলন হয়েছে। কাঁঠালের ক্ষেত্রেও তাই। সম্প্রতি একটি লেখায় এ ব্যাপারে নিম্নোক্ত অভিমত প্রকাশ পেয়েছে ঃ দেশের ফলবাগান ভরা। বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠে সিলেট-দিনাজপুরের লিচু আর সারা দেশের কাঁঠাল দেখলে মনে হয়, আল্লাহর রহমত নেমে এসেছে। কিন্তু রহমতের ৪০ শতাংশ পচে মাটিতে মিশে যায়। কারণ একটাই, আমরা ফল বেচি, প্রক্রিয়াজাত করি না। উদাহরণ স্বরূপ, লিচুর আয়ু মাত্র ৭২ ঘণ্টা। কাঁঠাল আকারে বড় হলেও পরিবহন খরচ আর পচনে কৃষকের ঘরে যায় মাত্র ১০ টাকা। অথচ একই লিচু চীনে ক্যান করে ২ বছর রাখে, একই কাঁঠাল আমেরিকায় ‘ভেগান মিট’ বানিয়ে কেজি ১০ ডলারে বিক্রি করে।
ইউরোপ-আমেরিকায় ভেগান, হাল ও গ্লুটেন ফ্রি খাবারের চাহিদা তুঙ্গে। কাঁঠাল সেখানে ‘মিরাকুল ফুড’। বাংলাদেশের কাঁঠাল মিষ্টি বেশী, আঁশ কম, তাই বিজ্ঞানীরা বলে ‘প্রিমিয়াম কোয়ালিটি’। দেশে প্রসেসিং প্লান্ট বা কারখানা গড়ে তোলা হলে কৃষক ফলের ভালো দাম পাবে, হবে কর্মসংস্থান। আসবে বৈদেশিক মুদ্রা। আর অপচয় কমলে বাড়বে খাদ্য নিরাপত্তা। শুধু লিচুর ফ্রোজেন পাল্প, কাঁঠালের ফ্রোজেন পাল্প এই দু’টি পণ্য ধরতে পারলে রপ্তানি আয় কয়েকগুণ বৃদ্ধি পাবে। এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সূত্রের পরামর্শ হচ্ছে, ২০ জন কৃষক মিলে একটা প্লান্ট স্থাপন করা যায়। এতে সরকার যদি ৫০ শতাংশ ভর্তুকি দেয়, তবে সবচেয়ে উত্তম। বারি ও বিসিএস আইআর দেবে ট্রেনিং। আর ইপিবিকে লিচু-কাঁঠালের বায়ার মিট আয়োজন করতে হবে দুবাই-লন্ডনে। লিচুর শেলফ লাইন বৃদ্ধির লক্ষ্যে গবেষণা, কাঁঠালের নতুন পণ্য নিয়ে গবেষণা প্রয়োজন। সিলেটের উন্নত মানের কৃষিপণ্য আনারস সংরক্ষণ ও প্রোসেসিংয়ের দাবি দীর্ঘদিনের। এদিকেও নজর দিতে হবে সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলোকে। দেশের অর্থনীতির প্রাণ কৃষিপণ্যের সুষ্ঠু উৎপাদন ও সংরক্ষণ-প্রক্রিয়াকরণ এখন সময়ের দাবি। আশা করা যায়, গণতান্ত্রিক সরকার এ ব্যাপারে উপযুক্ত পদক্ষেপ গ্রহণে কার্পণ্য করবে না।




