অপ্রতিরোধ্য গতিতে হাম
প্রকাশিত হয়েছে : ২২ জুলাই ২০২৬, ৪:০১:০৮ অপরাহ্ন
৪ মাসে মৃত্যু ৮শ’ ছুঁই ছুঁই, সিলেটে ১০৫
জালালাবাদ রিপোর্ট : মহামারি আকারে হাম ছড়িয়ে পড়ার পর ৪ মাস পেরিয়ে গেলেও পরিস্থিতি এখনো নিয়ন্ত্রণের বাইরে। ফলে প্রতিদিনই জ্যামিতিক হারে বাড়ছে আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা।
গত ২৬ জুন হাম ও হামের উপসর্গে শিশুর মৃত্যু ৭০০ ছাড়ায়। এর ২৬ দিনের মাথায় মৃত্যু ৮০০ ছুঁই ছুঁই হলো। একইসাথে সংক্রমণের সংখ্যা ইতোমধ্যে ১ লক্ষ ৩৪ হাজার হাজার ছাড়িয়ে গেছে। দীর্ঘ সময় পরও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে না আসায় এবং এত বিপুল সংখ্যক শিশুর মৃত্যুর জন্য অব্যবস্থাপনা ও ভুল সিদ্ধান্তকেই দায়ী করছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।
মঙ্গলবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হামবিষয়ক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, হামের উপসর্গে গত ২৪ ঘণ্টায় (সোমবার সকাল ৮টা থেকে মঙ্গলবার সকাল ৮টা) দেশে আরও ৪ শিশু মারা গেছে। এরমধ্যে সিলেটেরই ২ শিশু রয়েছে। বাকী দুজনের মধ্যে রাজশাহীতে ১ জন ও ময়মনসিংহে ১ জন মারা গেছে। এ নিয়ে গত ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত চার মাসের বেশি সময়ে হাম ও হামের উপসর্গে প্রাণ গেল ৭৯৭ শিশুর।
এছাড়া গত ২৪ ঘণ্টায় হাম ও হামের উপসর্গে আক্রান্ত হয়েছে এক হাজার আটটি শিশু। এর মধ্যে হাম শনাক্ত হয়েছে ১৩০ শিশুর। আর গত ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত ৪ মাসের বেশি সময়ে হাম ও হামের উপসর্গে আক্রান্ত হয়েছে ১ লাখ ৩৪ হাজার ১৫৬ শিশু।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ১ লাখ ২ হাজার ২৪৪ শিশু। তাদের মধ্যে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে ৯৮ হাজার ৪১১ শিশু।
সিলেটের চিত্র :
সিলেট বিভাগে হামের উপসর্গ নিয়ে আরও দুই শিশু মারা গেছে। সোমবার সকাল থেকে মঙ্গলবার সকালের মধ্যে এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং শহীদ শামসুদ্দিন আহমেদ হাসপাতালে তাদের মৃত্যু হয় বলে সিলেট স্বাস্থ্য বিভাগের সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ নূরে আলম শামীম জানিয়েছেন।
মৃত ৭ মাস বয়সী নুসিবা হবিগঞ্জ জেলার নবীগঞ্জ উপজেলার হুসেন মিয়ার মেয়ে। সে এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মারা যায়।
আর শহীদ শামসুদ্দিন আহমেদ হাসপাতালে মারা যাওয়া ২ বছর দুই মাস বয়সী রাফসা সিলেটের কানাইঘাট উপজেলার বাসিন্দা উযাছের আহমদের মেয়ে।
হাম নিয়ে সিলেট স্বাস্থ্য বিভাগের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মঙ্গলবার সকাল পর্যন্ত বিভাগের বিভিন্ন হাসপাতালে হামের উপসর্গ নিয়ে ২৭৩ জন রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন। এছাড়া আগের ২৪ ঘণ্টায় হামের সন্দেহভাজন আরও ৫১ জন রোগী বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।
চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত ল্যাবরেটরি পরীক্ষায় সিলেট বিভাগের ৫৪৫ জনের শরীরে হামের সংক্রমণ নিশ্চিত হয়েছে।
সিলেটে এখন পর্যন্ত হামের উপসর্গ নিয়ে মোট ১০১ জনের মৃত্যু হয়েছে। আর নিশ্চিত হামে চারজনের মৃত্যু হয়েছে বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। সবমিলিয়ে মারা গেছেন ১০৫ জন। হামের মৃত্যুও দিক দিয়ে ঢাকার পরেই সিলেটের অবস্থান।
রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. বেনজির আহমেদ এই পরিস্থিতির তীব্র সমালোচনা করেছেন। তার মতে, সরকারের ‘মিস ম্যানেজমেন্ট’ বা অব্যবস্থাপনার কারণেই এত বেশি প্রাণহানি ঘটেছে। তিনি উল্লেখ করেন, ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ার পরও হামকে ‘মহামারি’ ঘোষণা না করা এবং দেশজুড়ে ‘স্বাস্থ্য জরুরী অবস্থা’ জারি না করাটা সরকারের একটি বড় ভুল সিদ্ধান্ত ছিল।
জরুরী অবস্থা জারি না করার পেছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য থাকতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। ডা. বেনজির আহমেদ জানান, মহামারি ঘোষণা করলে এটিকে নিজেদের ব্যর্থতা বা দুর্বলতা হিসেবে গণ্য করা হবে- এমন একটি অমূলক রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে সরকার এই সিদ্ধান্ত এড়াতে পারে। অথচ শুরুতেই যদি জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে আইসিইউ সুবিধা বাড়ানো যেত এবং ডাক্তার ও নার্সদের বিশেষ প্রশিক্ষণ দিয়ে একসঙ্গে সর্বাত্মক যুদ্ধ ঘোষণা করা হতো, তবে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা অনেক কম হতো।
ইনস্টিটিউট অব এপিডেমিওলজি, ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড রিসার্চ (আইইডিসিআর) এর সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ড. মাহমুদুর রহমান হাম প্রতিরোধে উচ্চ টিকাদান কভারেজ, কার্যকর রোগ নজরদারি, দ্রুত প্রাদুর্ভাব শনাক্তকরণ এবং কমিউনিটির সম্পৃক্ততার ওপর গুরুত্ব দেন। তিনি টিকার প্রতি মানুষের আস্থা তৈরির প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেন। তিনি আক্রান্তের সংখ্যা বেশি এমন এলাকায় লক্ষ্যভিত্তিক টিকাদান কার্যক্রম পরিচালনার ওপরও গুরুত্ব দেন।






