বিদ্যুৎ ঘাটতি, অন্ধকারে গ্রামাঞ্চল
প্রকাশিত হয়েছে : ০৩ আগস্ট ২০২৬, ৮:০৯:২১ অপরাহ্ন
জালালাবাদ ডেস্ক: গ্যাস সংকটের কারণে আবার চাপে পড়েছে দেশের বিদ্যুৎব্যবস্থা। বিদ্যুৎ উৎপাদনে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হওয়ায় রাজধানী ও বড় শহরগুলোয় পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রিত রাখা গেলেও এর খেসারত দিতে হচ্ছে গ্রামাঞ্চলের মানুষকে। চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম থাকায় দিনের পর দিন দীর্ঘ সময় লোডশেডিংয়ের কবলে পড়ছে গ্রামের জনপদ। বিদ্যুৎহীনতায় ব্যাহত হচ্ছে কৃষিকাজ, ক্ষুদ্র ব্যবসা, শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা এবং সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা।
মূলত দেশে গ্যাস সংকট তীব্র আকার ধারণ করায় বিদ্যুৎ খাতে নতুন করে সংকট তৈরি হয়েছে। বড় শহরগুলোতে তুলনামূলকভাবে বিদ্যুৎ পরিস্থিতি সহনীয় থাকলেও গ্রামাঞ্চলে দীর্ঘ সময় ধরে লোডশেডিং হচ্ছে। এতে কৃষি, ক্ষুদ্র ব্যবসা, শিক্ষা কার্যক্রম ও সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. রেজাউল করিম বলেন, গ্যাস সংকটের কারণে আমাদের বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে গেছে। আবার গ্যাস না থাকায় শিল্পকারখানার ক্যাপটিভ বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে শিল্পগুলো এখন জাতীয় গ্রিডের বিদ্যুতের ওপর নির্ভর করছে। একই সঙ্গে বাসাবাড়িতে গ্যাসের স্বল্পতার কারণে অনেকেই বৈদ্যুতিক চুলা ব্যবহার করছেন। এতে বিদ্যুতের চাহিদা আরও বেড়েছে এবং লোডশেডিংও বৃদ্ধি পেয়েছে। গ্যাসের সরবরাহ না বাড়লে পরিস্থিতি আরও কঠিন হবে। গ্যাস সংকট কীভাবে বিদ্যুৎ খাতকে প্রভাবিত করছে: বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় ভিত্তি এখনও প্রাকৃতিক গ্যাস। বিপিডিবির সর্বশেষ উৎপাদন কাঠামো অনুযায়ী দেশের মোট উৎপাদন সক্ষমতার প্রায় ৪৮ থেকে ৫২ শতাংশ গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ওপর নির্ভরশীল। সক্ষমতার হিসেবে গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর মোট স্থাপিত ক্ষমতা প্রায় ১৩ থেকে ১৪ হাজার মেগাওয়াট। কিন্তু জ্বালানি সরবরাহ কমে যাওয়ায় এই কেন্দ্রগুলোর একটি বড় অংশ পূর্ণ সক্ষমতায় চালানো যাচ্ছে না। অনেক কেন্দ্রকে আংশিক উৎপাদনে যেতে হচ্ছে, আবার কিছু কেন্দ্র গ্যাস না পাওয়ায় সম্পূর্ণ বন্ধ থাকছে।
বিদ্যুৎ খাত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, একটি আধুনিক কম্বাইন্ড সাইকেল বিদ্যুৎকেন্দ্র চালাতে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ প্রয়োজন। গ্যাসের চাপ কমে গেলে টারবাইন নিরাপদে পরিচালনা করা যায় না। ফলে উৎপাদন কমিয়ে আনতে হয় অথবা কেন্দ্র বন্ধ রাখতে হয়।
চাহিদা ও উৎপাদনের ব্যবধান বাড়ছে: গ্রীষ্মকালে বাংলাদেশে বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদা সাধারণত ১৮ হাজার থেকে ২০ হাজার মেগাওয়াটের মধ্যে ওঠানামা করে। তবে সাম্প্রতিক গ্যাস সংকটের কারণে গড় উৎপাদন অনেক সময় ১৪ হাজার থেকে ১৬ হাজার মেগাওয়াটের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে। ফলে কয়েক হাজার মেগাওয়াটের ঘাটতি তৈরি হচ্ছে, যার প্রভাব পড়ছে লোডশেডিংয়ে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমানে শিল্প খাতের ক্যাপটিভ বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো স্বাভাবিকভাবে চালু থাকলে জাতীয় গ্রিডের ওপর এত বেশি চাপ পড়ত না। কিন্তু গ্যাসের অভাবে এসব কেন্দ্র বন্ধ থাকায় শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোও গ্রিড থেকে বিদ্যুৎ নিচ্ছে।
ক্যাপটিভ বিদ্যুৎ বন্ধে দ্বিমুখী চাপ: বাংলাদেশে শিল্প খাতে প্রায় ৩ হাজার মেগাওয়াটের বেশি ক্যাপটিভ বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা রয়েছে বলে সরকারি ও শিল্প খাতের বিভিন্ন তথ্যসূত্রে জানা যায়। বিশেষ করে তৈরি পোশাক, টেক্সটাইল, সিরামিক, স্টিল ও রাসায়নিক শিল্প নিজস্ব গ্যাসচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র ব্যবহার করে। গ্যাস সংকট দেখা দিলে এসব কেন্দ্র উৎপাদন বন্ধ করে দেয়। তখন শিল্পগুলো জাতীয় গ্রিড থেকে বিদ্যুৎ নেয়। ফলে একদিকে জাতীয় গ্রিডে চাহিদা বাড়ে, অন্যদিকে গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রগুলোও গ্যাসের অভাবে কম বিদ্যুৎ উৎপাদন করে। এতে সংকট আরও তীব্র হয়।
গ্যাস না থাকায় বাড়ছে বৈদ্যুতিক চুলার ব্যবহার: দেশের বিভিন্ন এলাকায় রান্নার গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় অনেক পরিবার ইনডাকশন কুকার ও বৈদ্যুতিক হিটার ব্যবহার শুরু করেছে। বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তাদের মতে, এটি সন্ধ্যার পিক আওয়ারে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে। সাধারণত সন্ধ্যা ৬টা থেকে রাত ১১টার মধ্যে বিদ্যুতের চাহিদা সর্বোচ্চ থাকে। এই সময় রান্না, শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র এবং শিল্প খাতের চাহিদা একসঙ্গে বাড়ায় লোডশেডিং আরও বাড়ছে। এর আগে হঠাৎ করে দেশে রান্নার এলপিজি সংকট দেখা দেয়। তখনও মানুষ বৈদ্যুতিক চুলার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছিল। সেই সময় পিডিবির তথ্য বলছে, বৈদ্যুতিক চুলার কারণে অন্তত এক হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুতের বেশি চাহিদা তৈরি হয়েছে গ্রিডে।
বাংলাদেশে বর্তমানে সরকারি হিসাবে মোট স্থাপিত বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ২৯ থেকে ৩০ হাজার মেগাওয়াট (গ্রিডভিত্তিক, আমদানিসহ)। তবে এই সক্ষমতার বড় অংশ সবসময় ব্যবহার করা সম্ভব হয় না।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, বিদ্যুৎ উৎপাদনের সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা এখন কেন্দ্রের সংখ্যা নয়, বরং জ্বালানি সরবরাহ। গ্যাস, এলএনজি, ফার্নেস অয়েল, ডিজেল ও কয়লার পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত না হলে উৎপাদন সক্ষমতা কাগজেই সীমাবদ্ধ থাকে। পর্যাপ্ত কয়লা, এলএনজি এমনকি জ¦ালানি তেলের সংকট রয়েছে। ফলে সরকারকে বাধ্য হয়ে চাহিদা থেকে কম বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে হচ্ছে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশীয় গ্যাসক্ষেত্র থেকে উৎপাদন কয়েক বছর ধরে কমছে। এই ঘাটতি পূরণে আমদানি করা এলএনজির ওপর নির্ভরতা বাড়লেও সম্প্রতি এলএনজি সরবরাহে বিঘ্ন এবং একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের কার্যক্রম বন্ধ থাকায় জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে বিদ্যুৎ উৎপাদনে।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি সামাল দিতে স্বল্পমেয়াদে এলএনজি সরবরাহ দ্রুত স্বাভাবিক করা, গ্যাসের সুষম বণ্টন নিশ্চিত এবং শিল্প ও বিদ্যুৎ খাতের মধ্যে জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় অগ্রাধিকার নির্ধারণ জরুরি। একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদে নতুন গ্যাস অনুসন্ধান, নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ বাড়ানো, বিদ্যুৎ সঞ্চালন ও বিতরণব্যবস্থার দক্ষতা উন্নয়ন এবং জ্বালানি উৎসের বহুমুখীকরণ ছাড়া এ ধরনের সংকট থেকে স্থায়ীভাবে বের হওয়া সম্ভব হবে না।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিদ্যুৎ জ¦ালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেছেন, মূলত এলএনজি টার্মিনাল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় এবং দ্রুত মেরামত না হওয়ায় গ্যাসের সরবরাহ কমে গেছে। তবে এলএনজি টার্মিনাল মেরামতের কাজ চলছে। শিগগিরই এলএনজি সরবরাহ বাড়বে। গ্যাসের সরবরাহ বাড়লে বিদ্যুৎ উৎপাদন পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে যাবে।
প্রসঙ্গত, গত ২১ জুলাই মহেশখালীতে মার্কিন মালিকানাধীন এক্সিলারেট এনার্জির ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিটের কারণে আগুন লেগে যায়। পরে বিদেশ থেকে বিশেষজ্ঞ এনে মেরামতের কাজ চলছে। তবে এখনও কবে নাগাদ ঠিক হবে সেটির নিশ্চয়তা তৈরি হয়নি। ফলে প্রায় ১০ দিনের বেশি হলো দেশে প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের জোগান কম। যার কারণে শিল্প কারখানা, বিদ্যুৎ কেন্দ্র, সার কারখানা, আবাসিক ব্যবহারকারী সবাই ভোগান্তির মধ্যে পড়েছেন।






