ইতিহাসের নীরব সাক্ষী জকিগঞ্জের সাজিদ রাজার বাড়ি
প্রকাশিত হয়েছে : ০৭ আগস্ট ২০২৬, ৮:০০:১৭ অপরাহ্ন
সংরক্ষণের অপেক্ষায় সম্ভাবনাময় পর্যটন কেন্দ্র

এখলাছুর রহমান, জকিগঞ্জ : সীমান্তঘেঁষা জনপদ জকিগঞ্জ-শিক্ষা, সংস্কৃতি, সাহিত্য, ধর্মীয় ঐতিহ্য ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অপূর্ব সমন্বয়ে গড়ে ওঠা এক ঐতিহাসিক অঞ্চল। উপজেলার বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে রয়েছে বহু প্রাচীন নিদর্শন, যার অন্যতম কাজলসার ইউনিয়নের চারিগ্রাম মৌজায় অবস্থিত সাজিদ রাজার বাড়ি। প্রায় তিন শতকের পুরোনো এই ঐতিহাসিক স্থাপনাটি আজও অতীতের গৌরবের নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
স্থানীয়ভাবে প্রচলিত ইতিহাস অনুযায়ী, অষ্টাদশ শতকের প্রথম দিকে ধর্মপ্রাণ জমিদার সাজিদ রাজা প্রায় ১৫ একর জমির ওপর নির্মাণ করেন এই বিশাল প্রাসাদসম কমপ্লেক্স। সময়ের নির্মম প্রবাহে অনেক স্থাপনা বিলীন হলেও এখনও বাড়ির বিভিন্ন অংশে অতীতের ঐতিহ্য ও স্থাপত্যশৈলীর ছাপ স্পষ্ট।
স্থাপনাটির অন্যতম আকর্ষণ ১৩ চালার বিশাল টিনের ঘর। জানা যায়, তৎকালীন কলকাতা থেকে আনা দক্ষ কারিগররা ১৩ হাজার টাকা মজুরিতে এটি নির্মাণ করেছিলেন। সে সময় এটি বিচারালয় হিসেবে ব্যবহৃত হতো। নির্মাণশৈলীর বৈচিত্র্য এখনও দর্শনার্থীদের মুগ্ধ করে।
বাড়ির পাশেই রয়েছে প্রায় সাত একর আয়তনের একটি বিশাল পুকুর। এর পাড়ে ১৭৪০ খ্রিস্টাব্দে নির্মিত পিলার ও গম্বুজশোভিত একটি দৃষ্টিনন্দন মসজিদ এবং প্রায় ২৭০ বছরের পুরোনো রাজপ্রাসাদের ধ্বংসাবশেষ আজও ইতিহাসের সাক্ষ্য বহন করছে।
স্থানীয়দের মুখে মুখে প্রচলিত আছে, সাজিদ রাজা জৈন্তিয়া রাজপরিবার থেকে এখানে এসে বসতি স্থাপন করেন। তাঁর পিতা ছিলেন ইছন রাজা। আরও শোনা যায়, হাসন রাজাসহ জৈন্তিয়া ও মোগল আমলের অনেক প্রভাবশালী ব্যক্তি এই বাড়িতে আসতেন। ইতিহাস, লোককথা ও কিংবদন্তির মিশেলে সাজিদ রাজার বাড়ি আজও বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে।
তবে দীর্ঘদিনের অবহেলা, সংস্কারের অভাব এবং যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ঐতিহাসিক এই স্থাপনাটির বিভিন্ন অংশ ধীরে ধীরে ক্ষয়প্রাপ্ত হচ্ছে। যথাসময়ে সংরক্ষণের উদ্যোগ না নিলে ইতিহাসের এই অমূল্য সম্পদ হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতœতাত্ত্বিক গুরুত্ব বিবেচনায় সাজিদ রাজার বাড়ি সংরক্ষণ ও পরিকল্পিতভাবে উন্নয়ন করা গেলে এটি সিলেট অঞ্চলের অন্যতম আকর্ষণীয় পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠতে পারে। এতে স্থানীয় অর্থনীতি, কর্মসংস্থান এবং পর্যটন শিল্পে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হবে।
সিলেট নগরী থেকে জকিগঞ্জগামী বাসে আটগ্রাম স্ট্যান্ডে নেমে রিকশায় অথবা ১০ থেকে ১৫ মিনিট হেঁটে সহজেই পৌঁছানো যায় এই ঐতিহাসিক স্থাপনায়। জকিগঞ্জ সদর থেকেও বাস বা সিএনজি অটোরিকশায় একই পথে যাতায়াত করা সম্ভব।
ইতিহাস শুধু বইয়ের পাতায় নয়, ইট-কাঠ-পাথরের নীরব স্থাপনায়ও বেঁচে থাকে। সাজিদ রাজার বাড়ি তেমনই এক অমূল্য ঐতিহ্য। যথাযথ সংরক্ষণ, পরিকল্পিত উন্নয়ন এবং কার্যকর প্রচারের মাধ্যমে এটি দেশের গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ও পর্যটন গন্তব্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে। ইতিহাসের এই সম্পদ রক্ষা করা শুধু জকিগঞ্জ বা সিলেটের নয়, সমগ্র জাতির সাংস্কৃতিক দায়িত্ব।






