দিল্লি যেতে পারেন প্রধানমন্ত্রী : কাটবে কি সংশয়ের রাত?
প্রকাশিত হয়েছে : ১৫ আগস্ট ২০২৬, ২:২৯:৩২ অপরাহ্ন
জালালাবাদ রিপোর্ট : দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের টানাপোড়েন ও নানামুখী জটিলতার মাঝেই আগামী সপ্তাহেই ভারত সফরে যেতে পারেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তাৎপর্যপূর্ণ ও সংবেদনশীল এই সফরকে কেন্দ্র করে ইতিমধ্যে ঢাকা এবং নয়াদিল্লি-দুই দেশের কূটনৈতিক মহলেই শুরু হয়েছে জোর প্রস্তুতি। আর এই সফরকে ঘিরেই এখন প্রশ্ন-তবে কি অবশেষে কাটতে চলেছে ঢাকা-দিল্লির দীর্ঘদিনের সন্দেহ-সংশয়ের রাত?
সংশ্লিষ্ট কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, দুই প্রতিবেশীর মধ্যকার বিদ্যমান শীতল পরিস্থিতি কাটিয়ে সম্পর্কের বরফ গলাতেই মূলত এই জরুরী সফরের আবহ তৈরি হচ্ছে। সফরে দুই দেশের শীর্ষ নেতৃত্বের মধ্যে সীমান্ত নিরাপত্তা, অমীমাংসিত তিস্তা চুক্তি এবং আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতির মতো গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুগুলো সরাসরি টেবিলে উঠতে পারে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান টানাপোড়েনের প্রেক্ষাপটে এই সম্ভাব্য সফরটি দুই দেশের ভবিষ্যৎ কূটনীতির মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, দিল্লিতে বিমসটেক সম্মেলনের আগে, আগামী সপ্তাহেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম ভারত সফরের প্রস্তুতি চলছে। প্রধানমন্ত্রীর সফরের সম্ভাব্য তারিখ হতে পারে ২২-২৩ অগাস্ট; অর্থাৎ, ভারতের স্বাধীনতা দিবসের ঠিক এক সপ্তাহ পর।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো ঘোষণা দেয়নি। কর্মকর্তারাও নাম প্রকাশ করে কথা বলতে রাজি হননি।
তবে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলোও তারেক রহমানের সম্ভাব্য সফর নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করতে শুরু করেছে।
এনডিটিভি লিখেছে, সম্ভাব্য এই সফরে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে তারেক রহমানের বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। বৈঠকে দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হতে পারে। এর মধ্যে বাণিজ্য, যোগাযোগ, জ্বালানি, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা গুরুত্ব পেতে পারে।
সব ঠিক থাকলে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে এটাই হবে তারেক রহমানের প্রথম ভারত সফর। দুই প্রতিবেশী দেশের সম্পর্কের গতিপথ নির্ধারণের ক্ষেত্রেও এ সফর তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠবে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বরাতে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমটি লিখেছে, দুই দিনের এই সফরকে দ্বিপক্ষীয় সফর হিসেবেই পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
ঢাকার সরকারি সূত্রগুলো বলছে, প্রতিবেশী দেশটিতে প্রধানমন্ত্রীর প্রথম সফরের জন্য নীরবে হলেও নিশ্চিতভাবেই প্রস্তুতি এগিয়ে চলছে।
গত সপ্তাহে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ভারতীয় হাই কমিশনার (যিনি ভারতের কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর মর্যাদা পান) দীনেশ ত্রিবেদীর বৈঠকটি এই সংক্ষিপ্ত সফরের বিষয়ে মত পরিবর্তনে ভূমিকা রেখে থাকতে পারে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র বলেছে, জাতিসংঘ অধিবেশনে সভাপতিত্ব করতে আগামী ২৭ বা ২৮ অগাস্ট যুক্তরাষ্ট্রে চলে যাবেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান। তার আগে তিনি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ভারত সফরে যোগ দেবেন।
মোদী-তারেকের সম্ভাব্য প্রথম বৈঠক :
এনডিটিভি লিখেছে, নরেন্দ্র মোদী ও তারেক রহমানের সম্ভাব্য বৈঠকের দিকে বিশেষ নজর থাকবে দুই দেশেরই।
তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপির সরকার ক্ষমতায় আসার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক সমীকরণে পরিবর্তন এসেছে। এর ফলে ঢাকার সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে ভারতকেও নতুন করে কৌশল নির্ধারণ করতে হচ্ছে।
২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্কে টানাপড়েন তৈরি হয়। বিশেষ করে ভারতে শেখ হাসিনার অবস্থান এবং তাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর অনুরোধ নিয়ে দুই দেশের মধ্যে চাপা উত্তেজনা রয়েছে।
তবে গত নির্বাচনের পর থেকে দিল্লি ও ঢাকা দুই তরফেই সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার বার্তা দেওয়া হয়েছে বিভিন্নভাবে। সাম্প্রতিক সময়ে দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক যোগাযোগও কিছুটা বাড়ার ইঙ্গিত মিলেছে।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান এপ্রিলে নয়াদিল্লি সফর করে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের সঙ্গে বৈঠক করেন। পরে ১০ অগাস্ট ঢাকায় ভারতীয় হাই কমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠক করেন। সেখানেও বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার বার্তা এসেছে; তবে সেজন্য ‘সহায়ক পরিবেশ’ তৈরির ওপর জোর দিয়েছে ঢাকা।
হাসিনার প্রত্যর্পণ ‘বড় ইস্যু’ :
এনটিভি লিখেছে, ভারত সফরে তারেক রহমানের আলোচনায় শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠানোর বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
২০২৪ সালের ৫ অগাস্ট ক্ষমতাচ্যুত হয়ে বাংলাদেশ ছাড়ার পর থেকে শেখ হাসিনা ভারতে অবস্থান করছেন। মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনাল তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার পর তাকে দেশে ফেরত পাঠানোর জন্য নয়াদিল্লির কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে অনুরোধ জানায় ঢাকা।
ভারত বলে আসছে, বাংলাদেশের অনুরোধ তারা ‘যথাযথ আইনি ও কূটনৈতিক প্রক্রিয়ায়’ পর্যালোচনা করছে। তবে ভারত তাকে ফেরত দেবে, তেমন সম্ভবনা দেখছেন না অধিকাংশ বিশ্লেষক।
গত ৫ আগস্ট দিল্লির সংবাদ সম্মেলনে শেখ হাসিনা বক্তব্য দেওয়ার পর ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছিল ঢাকা।
পানি, বাণিজ্য ও সীমান্ত :
এনডিটিভির প্রতিবেদনে বলা হয়, দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে শেখ হাসিনা প্রসঙ্গের পাশাপাশি আরও বেশ কিছু অমীমাংসিত সমস্যা রয়েছে। দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর সম্ভাব্য বৈঠকে বাণিজ্য ও ট্রানজিট, জ্বালানি সহযোগিতা, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা এবং যোগাযোগব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা হতে পারে।
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে দীর্ঘ স্থলসীমান্ত রয়েছে। দুই দেশের মধ্যে অর্থনৈতিক ও পরিবহন যোগাযোগও রয়েছে। ফলে রাজনৈতিক সম্পর্কের উন্নতি হলে এসব ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব থাকবে।
পানি বণ্টনও দুই দেশের আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হতে পারে। ১৯৯৬ সালে সই হওয়া গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তির মেয়াদ আসছে ডিসেম্বরে শেষ হওয়ার কথা। সে কারণে স্বাভাবিকভাবেই চুক্তি নবায়নের আলোচনা বৈঠকে গুরুত্ব পাবে।
অন্যদিকে বাংলাদেশের সঙ্গে স্থিতিশীল সম্পর্ক ভারতের জন্যও জরুরী। দুই দেশের অভিন্ন সীমান্তের পাশাপাশি বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান এবং ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর সঙ্গে এর যোগাযোগও নয়াদিল্লির কাছে গুরুত্বপূর্ণ।






