মৌলভীবাজারে ২ কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগে গ্রেপ্তার ৪
প্রকাশিত হয়েছে : ০১ অক্টোবর ২০২৬, ৬:২১:৪৮ অপরাহ্ন

মৌলভীবাজার প্রতিনিধি : প্রাচীন সীমানা পিলার ও মূল্যবান ধাতব বস্তু বিক্রির প্রলোভন দেখিয়ে প্রায় ২ কোটি ২১ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগে প্রতারক চক্রের চার সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে মৌলভীবাজার জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন-রাজনগর উপজেলার বাংলা টিলা এলাকার এস এম ইলিয়াছুর রহমান (৩৬), শ্রীমঙ্গল উপজেলার উত্তর ভাড়াউড়া গ্রামের মো. ইকরাম মিয়া (২৮), ঢাকার মোহাম্মদপুরের শ্যামলী এলাকার তাহের-উল-ইসলাম ওরফে আখতারুজ্জামান (৬১) এবং মোহাম্মদিয়া হাউজিং এলাকার মো. ইব্রাহিম বেপারী (৩৭)।
বৃহস্পতিবার দুপুরে মৌলভীবাজার জেলা পুলিশ সুপার কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান অতিরিক্ত পুলিশ সুপার নোবেল চাকমা।
পুলিশ জানায়, চক্রটি বিশ্বের বিভিন্ন নামিদামি প্রতিষ্ঠানের বাংলাদেশের প্রতিনিধি পরিচয় দিয়ে দীর্ঘদিন ধরে প্রতারণা করে আসছিল। তারা ব্রিটিশ আমলের মূল্যবান ধাতব বস্তু, প্রাচীন কয়েন ও এন্টিক সামগ্রী ক্রয়-বিক্রয়ের নামে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নিত।
মামলার অভিযোগ অনুযায়ী, প্রায় ছয় মাস আগে রাজনগরের বালিসহস্র গ্রামের ব্যবসায়ী আব্দুর রহিমের সঙ্গে পূর্বপরিচিত এস এম ইলিয়াছুর রহমানের মাধ্যমে চক্রটির পরিচয় হয়। পরে তাকে জানানো হয়, চাতলাপুর চা বাগানের কয়েকজনের কাছে ব্রিটিশ আমলের একটি মূল্যবান ধাতব বস্তু রয়েছে, যার মূল্য হাজার কোটি টাকারও বেশি। ঢাকার একটি প্রতিষ্ঠান সেটি কিনতে আগ্রহী এবং মধ্যস্থতা করতে পারলে বিপুল লাভ হবেÑএমন প্রলোভন দেখানো হয়।
একপর্যায়ে আব্দুর রহিমের আমেরিকাপ্রবাসী মামাতো ভাই মির্জা খালেদুর রহমানকেও এ কাজে যুক্ত করা হয়। চক্রের সদস্য তাহের-উল-ইসলাম নিজেকে ‘ইউএস হেরিটেজ অকশন’-এর বাংলাদেশ কান্ট্রি ডিরেক্টর পরিচয় দিয়ে কথিত বস্তুটি কেনার বিষয়ে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। পরে বস্তুটির সত্যতা যাচাইয়ের জন্য একজনকে ‘এক্সপার্ট’ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। ২০২৩ সালের ১৯ আগস্ট চাতলাপুর চা বাগানে নিয়ে কথিত এক্সপার্ট বস্তুটি পরীক্ষা করে মূল্যবান বলে জানায়। এতে ভুক্তভোগীদের মধ্যে বস্তুটির বিষয়ে বিশ্বাস তৈরি হয়।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, এরপর বাগানীদের অর্থ দেওয়ার কথা বলে প্রথমে ২৫ লাখ টাকা করে চারটি স্বাক্ষরিত চেক নেওয়া হয়। পরে ২০২৩ সালের ২৭ অক্টোবর চাতলাপুর চা বাগানে কথিত বস্তুটি হস্তান্তরের সময় নগদ ২ কোটি টাকা নেওয়া হয়। আরও দেড় কোটি টাকা দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে মোট সাড়ে ৩ কোটি টাকার লেনদেন হয়েছেÑএমন বিশ্বাস তৈরি করা হয়। এরপর একটি বক্সে কথিত মূল্যবান বস্তুটি দিয়ে দুই দিন পর আরও ১০ কোটি টাকা দিয়ে সেটি নিয়ে যেতে বলা হয়। বক্সটি সিলেটে এনে নির্ধারিত সময় পর খোলা হলে ভুক্তভোগীরা দেখতে পান, সেখানে কোনো মূল্যবান ধাতব বস্তু নেই; বরং একটি সাপ রাখা রয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, পরে চক্রের সদস্যরা দাবি করে, টাকা নিয়ে বিরোধের কারণে কথিত ‘আইটেম’ জিনের মাধ্যমে সাপে পরিণত হয়েছে এবং ২১ দিন পর সেটি ফিরে আসবে। এভাবে বিভিন্ন কথা বলে সময়ক্ষেপণ করা হয়। পরবর্তীতে আরও একটি মূল্যবান বস্তু পাওয়ার কথা বলে অতিরিক্ত ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা নেওয়া হয়। দীর্ঘদিনেও টাকা বা কথিত মূল্যবান বস্তু ফেরত না পাওয়ায় বিষয়টি প্রতারণা হিসেবে বুঝতে পারেন ভুক্তভোগীরা। এ ঘটনায় ২০২৪ সালে কুলাউড়া থানায় মামলা করা হয়। মামলার অভিযোগ অনুযায়ী, বিভিন্ন সময়ে মোট প্রায় ২ কোটি ২১ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে।
অভিযানের সময় এস এম ইলিয়াছুর রহমান ও মো. ইকরাম মিয়াকে শ্রীমঙ্গল থেকে এবং তাহের-উল-ইসলাম ও মো. ইব্রাহিম বেপারীকে ঢাকার মোহাম্মদপুর থেকে গ্রেপ্তার করা হয়।
পুলিশ তাদের কাছ থেকে কথিত ২০০ কোটি টাকা মূল্যের একটি ‘এন্টিক পাওয়ার কয়েন’, একটি নোহা গাড়ি, আটটি মোবাইল ফোন, ৫০০টি ভিজিটিং কার্ড, ৯৪ পাতা ভুয়া বিজনেস এগ্রিমেন্ট, তিনটি চেকবই, কয়েন ব্ল্যাংক অ্যালবাম, ডায়েরি, ১০টি সিমকার্ড, ছয়টি ভুয়া স্ট্যাম্প এবং ‘এন্টিক গ্যালারি ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড’-এর নামে একটি ভুয়া সার্টিফিকেট জব্দ করেছে।
এ ঘটনায় জড়িত অন্যদের শনাক্ত ও তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া চলছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।





