নগরের মোড়ে মোড়ে বেওয়ারিশ কুকুর
প্রকাশিত হয়েছে : ০৮ অক্টোবর ২০২৬, ৬:১৪:৪৩ অপরাহ্ন
৫ বছর ধরে নেই নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ

মামুন পারভেজ : সকাল কিংবা রাত, ঘরের বাইরে পা রাখতেই তাড়া করে কুকুরের কামড়ের ভয়। সিলেট নগরের সড়কগুলো এখন যেন পথচারীদের নয়, বরং বেওয়ারিশ কুকুরের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। মোড়ে মোড়ে কুকুরের দলবদ্ধ অবস্থান আর হিংস্র আচরণে জিম্মি হয়ে পড়েছেন সাধারণ মানুষ। অথচ নগরবাসীর এই চরম ভোগান্তি আর আতঙ্ক দূর করতে কর্তৃপক্ষের কোনো নিয়ন্ত্রণ উদ্যোগ চোখে পড়ছে না।
নগরজুড়ে কুকুর বাড়লেও প্রায় ৫ বছর ধরে নেই টিকা কার্যক্রম। যদিও চলতি মাসের মাঝামাঝি সময় থেকে এ কার্যক্রম শুরু হবে বলে দাবি করছেন সংশ্লিষ্টরা। এবারের কর্মসূচিতে সিলেট সিটি করপোরেশন এলাকার প্রায় ৪ হাজার কুকুরকে টিকা দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
নগরের মিজাজাঙ্গাল, জামতলা, দাড়িয়াপাড়া জালালাবাদ, উপশহর, শিবগঞ্জ, কুয়ারপাড়, পীরমহল্লা, জালালাবাদসহ বিভিণœ এলাকায় কুকুরের উৎপাতের কথা জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা। কুকুর কামড়ানোর চেয়ে উৎপাতের অভিযোগই বেশি।
নগরবাসীর অভিযোগ, সিলেট শহরের বিভিন্ন এলাকায় বেওয়ারিশ কুকুরের দল ঘুরে বেড়াচ্ছে। রাতের বেলায় এসব কুকুরের উৎপাত আরও বেড়ে যায়। পথচারী, শিক্ষার্থী, শিশু ও মোটরসাইকেল আরোহীদের অনেকেই কুকুরের ধাওয়ার শিকার হচ্ছেন। কোথাও কোথাও কুকুরের দল নিয়ে মানুষের মধ্যে আতঙ্কও তৈরি হয়েছে।
নগরবাসী বলছেন, শুধু টিকাদান করলেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। কুকুরের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ, বেওয়ারিশ কুকুর ব্যবস্থাপনা এবং নিয়মিত টিকাদানের পাশাপাশি নগরীর ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো চিহ্নিত করে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেওয়া প্রয়োজন।
নগরের দাড়িয়াপাড়া এলাকার বাসিন্দা কুলসুমা জানান, ‘তিনি প্রতিদিন কাজে জামতলা যান। রাস্তায় দল বেঁধে থাকা কুকুর প্রায়ই তাকে তাড়া করে।’ কুকুর নিধনের আদালতের নিষেধাজ্ঞা থাকায় প্রতি বছরই বাড়ছে বেওয়ারিশ কুকুরের সংখ্যা বলে দাবি ভুক্তভোগীদের।
নগরের উপশহর এলাকার স্কুল শিক্ষক রাজিব রায় বলেন, ‘কুকুর পরিবেশের একটি অংশ হলেও নিয়ন্ত্রণহীন বংশবৃদ্ধি মানুষের নিরাপত্তার জন্য হুমকি তৈরি করতে পারে। তাই একদিকে যেমন প্রাণীর প্রতি মানবিক আচরণ নিশ্চিত করতে হবে, অন্যদিকে তেমনি মানুষের নিরাপত্তার বিষয়টিও সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। নিয়মিত টিকাদান, নির্বীজন (গর্ভনিরোধক) ও জনসচেতনতার সমন্বিত কার্যক্রমই এ সমস্যার টেকসই সমাধান হতে পারে।’
সিলেট সিটি করপোরেশনের স্বাস্থ্য বিভাগের সূত্র জানায়, সর্বশেষ ২০২১ সালে নগরীতে কুকুরকে টিকা দেওয়া হয়েছিল। ওই সময় প্রায় ২ হাজার কুকুরকে টিকা দেওয়া হয়। এরপর দীর্ঘসময় ধরে নগরীতে এ ধরনের কার্যক্রম বন্ধ ছিল। ফলে বেওয়ারিশ কুকুরের সংখ্যা ও উৎপাত নিয়ে নগরবাসীর মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে।
জানা যায়, সিটি করপোরেশনের অর্থায়নে এবার কুকুরের টিকাদান কার্যক্রম বা ‘ক্রাশ প্রজেক্ট’ বাস্তবায়ন করা হবে। জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ ও প্রাণিসম্পদ বিভাগের সহযোগিতায় এ কার্যক্রম বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে। এর মাধ্যমে নগরের বিভিন্ন এলাকায় থাকা বেওয়ারিশ কুকুর শনাক্ত করে টিকা দেওয়ার পাশাপাশি জলাতঙ্ক প্রতিরোধে সচেতনতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে।
জেলা প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, কুকুরের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ ও জলাতঙ্কের ঝুঁকি কমাতে নিয়মিত টিকাদান গুরুত্বপূর্ণ। নগরীতে বিপুলসংখ্যক বেওয়ারিশ কুকুর থাকায় একবার টিকা দেওয়ার পর দীর্ঘসময় কার্যক্রম বন্ধ থাকলে এর সুফল ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। তাই এবারের কর্মসূচিতে যত বেশি সম্ভব কুকুরকে টিকার আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে।
জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের সূত্রও বলছে, কুকুরের কামড়ের ঘটনা জলাতঙ্কের মতো প্রাণঘাতী রোগের ঝুঁকি তৈরি করে। বিশেষ করে কুকুর কামড়ানোর পর দ্রুত চিকিৎসা না নিলে ঝুঁকি বাড়তে পারে। তাই কুকুরের টিকাদানের পাশাপাশি কেউ কুকুরের কামড় বা আঁচড়ের শিকার হলে দ্রুত হাসপাতালে গিয়ে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও টিকা নেওয়ার বিষয়ে জনসচেতনতা জরুরি।
সিটি করপোরেশনের স্বাস্থ্য বিভাগ সূত্র জানায়, চলতি মাসের মাঝামাঝি সময়ে কর্মসূচি শুরু করার প্রস্তুতি চলছে। নগরের প্রায় ৪ হাজার কুকুরকে টিকা দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। এর মাধ্যমে কুকুরের মাধ্যমে জলাতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি কমানোর পাশাপাশি নগরবাসীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই মূল লক্ষ্য।
বিষয়টি নিশ্চিত করে সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. মো. জাহিদুল ইসলাম দৈনিক জালালাবাদকে বলেন, ‘নগরবাসীর নিরাপত্তার বিষয়টি আমাদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বেওয়ারিশ কুকুরের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে আনতে নিয়মিত টিকাদান ও নির্বীজন (গর্ভনিরোধক) কার্যক্রম জোরদার করা প্রয়োজন। আদালতের নির্দেশনা ও প্রাণীকল্যাণের বিষয়টি বিবেচনায় রেখেই কুকুরের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আশা করছি চলতি মাসেই কার্যক্রম শুরু করতে পারবো। টিকাদানকারী কর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে। তাদের শিডিউল পেলেই কার্যক্রম শুরু করা হবে। পাশাপাশি নগরবাসী যাতে কুকুরের আক্রমণের শিকার না হন, সে বিষয়েও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ তিনি আরও বলেন, সিলেট সিটি করপোরেশনের অর্থায়নে টিকা কার্যক্রম জেলা স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও জেলা প্রাণী সম্পদ অধিদপ্তর বাস্তবায়ন করবে।
পরিবেশবাদী সংগঠন ‘ভূমিসন্তান বাংলাদেশ’-এর সমন্বয়ক ও প্রাণী অধিকার কর্মী আশরাফুল কবির দৈনিক জালালাবাদকে বলেন, ‘কুকুরের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ার সমস্যার সমাধান কুকুর নিধন নয়। বৈজ্ঞানিক ও মানবিক পদ্ধতিতে নির্বীজন (গর্ভনিরোধক) এবং জলাতঙ্কের টিকা দেওয়ার মাধ্যমে ধীরে ধীরে সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে। তাদের প্রতি মমতা দরদী দৃষ্টিতে তাকাতে হবে। দেখুন একটি প্রাণী কখন আক্রমণাত্মক হয়। যখন তার খাদ্যের সংকট দেখা দেয়। একই সঙ্গে নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রম চালু রাখতে হবে। মানুষ ও প্রাণীÑদুই পক্ষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করেই এ সমস্যার স্থায়ী সমাধান করতে হবে।’
এ বিষয়ে জানতে জেলা প্রাণি সম্পদ কর্মকর্তা ডা, রফিকুল ইসলামের মুঠোফোনে কল দিলে তা ব্যস্ত ও পরে বন্ধ পাওয়া যায়।
সিলেটের ডেপুটি সিভিল সার্জন ডা. জন্মেজয় দত্ত দৈনিক জালালাবাদকে বলেন, ‘ কুকুর সাধারণত রোগাক্রান্ত না হলের কামড়ায় না। ভ্যাকসিন দেওয়ার পরেও কুকুর সংক্রামক রোগে আক্রান্ত হতে পারে। ভ্যাকসিন কাযক্রমের আওতায় সব কুকুর আনা সম্ভবও নয়। তাই আমরা ঝুঁকি নিতে চাই না। তাই কুকুর কামড়ালে ভ্যাকসিন নিতে বলি। তিনি আরও বলেন, ‘জলাতঙ্ক একটি মারাত্মক রোগ হলেও সময়মতো কুকুরের টিকাদান এবং আক্রান্ত ব্যক্তিকে দ্রুত চিকিৎসার আওতায় আনা গেলে এটি প্রতিরোধ করা সম্ভব। কোনো কুকুর কামড় বা আঁচড় দিলে ক্ষতস্থান দ্রুত সাবান ও প্রবাহমান পানি দিয়ে প্রায় ১৫ মিনিট ধুয়ে দ্রুত হাসপাতালে গিয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। নগরে ব্যাপক হারে কুকুরের টিকাদান করা গেলে জলাতঙ্কের ঝুঁকি অনেকটাই কমিয়ে আনা সম্ভব।’






