খাদ্যাভাব বনাম খাদ্যের অপচয়
প্রকাশিত হয়েছে : ০৭ জুলাই ২০২৪, ১২:৩৫:১৯ অপরাহ্ন
এক জরীপে দেখা গেছে, বিশ্বের শতাধিক কোটি মানুষ রাতে অভুক্ত অবস্থায় নিদ্রা যায়। অর্থাৎ দিনের বেলা তাদের কিছু খাবার জুটলেও রাতের জন্য কিছুই থাকে না। এদের সিংহভাগই এশিয়া ও আফ্রিকা মহাদেশের চরম দরিদ্র শ্রেণীর লোক। জ্ঞান বিজ্ঞানের এই উৎকর্ষ ও সভ্যতার যুগে এ তথ্য যুগপৎ দুঃখজনক ও হতাশাব্যঞ্জক। আরেক জরীপে দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্র ও জার্মানীসহ বিশ্বের ধনী ও উন্নত দেশগুলো প্রতি বছর যে পরিমাণ খাবার অপচয় করে তা দিয়ে বিশ্বের দরিদ্র দেশগুলোর কয়েক বছরের খাদ্যের চাহিদা মেটানো সম্ভব।
শুধু তাই নয়, ইতোপূর্বে বিশ্ব খাদ্য সংস্থা (ফাও) পরিচালিত ‘বৈশ্বিক খাদ্য ক্ষতি ও খাদ্য অপচয়’ শীর্ষক এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, বিশ্বের খাদ্যের প্রায় এক তৃতীয়াংশ (১০০ কোটি টন) অপচয় হয়। একইভাবে সম্প্রতি আন্তর্জাতিক ধান গবেষণা কেন্দ্র (আইআরআরআই) এর নিয়মিত গবেষণাপত্রে প্রকাশিত ‘রাইস টুডে’ শীর্ষক এক সমীক্ষা থেকে জানা গেছে, বিশ্বের অন্যতম চাল আমদানীকারক দেশ ফিলিপাইনে প্রতি বছর কমপক্ষে সোয়া ৪ কোটি টাকা মূল্যের চাল বা ভাত বিনষ্ট হয়।
দেখা গেছে, এই চাল বা ভাত রান্না করতে হাড়ি বা পাত্রের তলদেশে পুড়ে গিয়ে কিংবা বাচ্চারা বা বড়োরা খাওয়ার পর অবহেলায় কিংবা ফেলে দেওয়ার ফলে নষ্ট হয়। নষ্ট হয় হোটেল রেস্তোরাঁগুলোতেও। বিশ্বে যখন কোটি কোটি মানুষ এক মুঠো খাবারের জন্য সংগ্রাম করছে, অর্ধাহারে অনাহারে দিন কাটাচ্ছে তখন একশ্রেণীর বিত্তবান মানুষ বিপুল পরিমাণ খাদ্য অপচয় করছে। এমনকি সৌদীআরবের মতো ধনী দেশে প্রতি মাসে যত খাদ্যের অপচয় হয় তা দিয়ে ইয়েমেন এর লাখ লাখ অভুক্ত মানুষের বছরের খাদ্যাভাব মিটে। গত ক’বছর ধরে গোটা বিশ্বে খাদ্যের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় সীমিত আয়ের মানুষকে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। এ অবস্থায় খাদ্যের অপচয় যেমন অপরিনামদর্শি তেমনি অমানবিক আচরণের শামিল।
বাংলাদেশের জনসংখ্যার ৬০ ভাগ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নীচে বাস করে। ৪০ ভাগ বাস করে চরম দারিদ্র্যের মধ্যে। কিন্তু এই বাংলাদেশেও বিত্তবানদের প্রতিদিন প্রচুর পরিমাণ খাদ্যের অপচয় কিংবা খাদ্য বিনষ্ট করতে দেখা যায়। শুধু বিত্তবান নয়, সাধারণ লোকজনের ঘরেও প্রতিদিন অনেক খাবার নষ্ট হয়। এটা অনেক ক্ষেত্রে অসচেতনতা ও রান্না বান্না বা ফলমূল ও শাকসবজি কাটাকাটির ক্ষেত্রে সুষ্ঠু পরিকল্পনা ও পদ্ধতির অভাবে হয়। অনেকে বিষয়টিকে তুচ্ছ মনে করেন। কিন্তু এই সামান্য বা তুচ্ছ ত্রুটি বিচ্যুতি ও অবহেলা কোটি কোটি মানুষ সংঘটন করলে এর পরিমাণ আর ক্ষুদ্র থাকে না, বিশাল হয়ে দাঁড়ায়।
খাদ্য তথা সম্পদের অপচয় ধর্মীয় ও নৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকেও অত্যন্ত নিন্দনীয় ও বর্জনীয়। ইসলাম ধর্মে অপচয়কারীকে শয়তানের ভাই আখ্যা দেয়া হয়েছে। শুধু ধর্ম নয় নৈতিক ও মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকেও অপচয় থেকে বিরত থাকা এবং অন্যকে বিরত থাকতে উৎসাহিত করা সকল বিবেকবান মানুষের কর্তব্য। বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে অপচয়ের চিত্রও ভয়াবহ। এটা দেশের উন্নয়নের পরিপন্থী। ব্যক্তি ও রাষ্ট্র উভয় পর্যায়ে খাদ্যসহ সকল সম্পদের ক্ষেত্রে অপচয় বন্ধ বা হ্রাস করার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সকলের সচেতনতা প্রয়োজন। আমরা এ ব্যাপারে সকলের দৃষ্টি ও মনোযোগ আকর্ষণ করছি।




