উচ্চশিক্ষায় অগ্রাধিকার প্রসঙ্গে
প্রকাশিত হয়েছে : ০৫ মে ২০২৬, ১২:১১:৩৪ অপরাহ্ন
সম্প্রতি মিডিয়ায় ‘উচ্চশিক্ষায় অগ্রাধিকার কী হওয়া উচিত’ শীর্ষক একটি গুরুত্বপূর্ণ ও দিক নির্দেশনামূলক লেখা প্রকাশিত হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, বিশ্বের উন্নত দেশগুলো যেমন প্রাথমিক শিক্ষাকে শক্ত ভিত্তি হিসেবে গড়ে তুলে তাদের শিক্ষা ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজিয়েছে, বাংলাদেশেরও উচিত প্রাথমিক শিক্ষাকে গুরুত্ব দিয়ে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষার ইতিবাচক পরিবর্তনের জন্য কাজ করে যাওয়া।
এতে আরো বলা হয়েছে, বিশ্বায়নের যুগে শিক্ষা ব্যবস্থা শুধু মানব সম্পদ তৈরীর একটি মাধ্যম নয়, বরং এটি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, সামাজিক স্থিতিশীলতা ও প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনের কেন্দ্রবিন্দু। বাংলাদেশে উচ্চ শিক্ষার কেন্দ্র অর্থাৎ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বর্তমানে উদ্ভাবনী গবেষণা অপ্রতুল, যা উন্নত দেশসমূহের শিক্ষা ব্যবস্থার অন্যতম অগ্রাধিকার। বিদেশে অত্যাধুনিক প্রযুক্তিগত উন্নয়ন নিয়ে গবেষণাই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রধান কাজ। কিন্তু বাংলাদেশে এ ধরনের গবেষণা কিছুটা হলেও পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে উদ্ভাবনী চিন্তা শেষ পর্যন্ত আলোর মুখ দেখে না। দুর্ভাগ্যজনক ব্যাপার হচ্ছে, যুক্তরাজ্যের মতো উন্নত দেশগুলোর উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য বিভিন্ন বিষয়ে আলাদা গবেষণা কাউন্সিল ও গবেষণার জন্য প্রতিযোগিতামূলক প্রক্রিয়ায় গবেষণা বরাদ্দ থাকলেও বাংলাদেশে এর ভগ্নাংশও নেই।
অর্থনৈতিক কৌশলের সঙ্গে শিক্ষার একটি সংযোগ তৈরী করা আবশ্যক। এশিয়ার দেশ চীনের দিকে তাকালে দেখা যায়, দেশটি তাদের শিক্ষা ব্যবস্থাকে সরাসরি অর্থনৈতিক কৌশলের সঙ্গে যুক্ত রেখেছে, যার মধ্য দিয়ে তারা কেবল মানবসম্পদই তৈরী করেনি, বরং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করেছে। অন্যান্য উন্নত দেশগুলোও তা-ই করছে। তাই বাংলাদেশের অর্থনৈতিক খাতের সঙ্গে যোগাযোগ বৃদ্ধির জন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সাথে দেশের শিল্প প্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট বিষয়ের বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে সহযোগিতামূলক ও পেশাগত সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে। এভাবে শিক্ষার্থীদের লেখাপড়ার সঙ্গে শিল্প ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের যৌথ উদ্যোগ গড়ে তুলতে হবে। যদি এটা করা হয়, তবে শিক্ষা হয়ে ওঠবে বাস্তবসম্মত ও প্রায়োগিক। এর ফলে শিক্ষার্থীদের বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকার সময়ই সরাসরি কাজের অভিজ্ঞতা তৈরী হবে, যা তাদের গড়ে তুলবে অভিজ্ঞ ও দক্ষ মানব শক্তি হিসেবে। পাশাপাশি দক্ষ ও মানব শক্তিতে রূপান্তরের জন্য মাধ্যমিক পর্যায় থেকেই কারিগরি শিক্ষার প্রতি গুরুত্ব আরোপ করা প্রয়োজন। দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গে, বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়ে কারিগরি শিক্ষা ব্যবস্থার একটি কার্যকর সমন্বয় সাধন করা যায়, তাহলে শিক্ষার্থীরা আরো বেশী দক্ষ হয়ে গড়ে ওঠবে। এভাবে বিষয় অনুযায়ী দক্ষতা তৈরী সম্ভব হবে।
এখানে বলা আবশ্যক, শিক্ষার্থীদের এমন দক্ষ করে গড়ে তোলার জন্য প্রয়োজন শিক্ষকদের দক্ষতার উন্নয়ন এবং মেধাবীদের শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ। কিন্তু এদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এই জিনিসটার মারাত্মক ঘাটতি বিদ্যমান। দেখা যাচ্ছে, শিক্ষক নিয়োগে মেধাভিত্তিক চর্চার পরিবর্তে রাজনৈতিক প্রভাব ও পরিচিতিই হয়ে ওঠেছে পাবলিক অর্থাৎ সরকারী বিশ্ববিদ্যালয় সমূহে শিক্ষক নিয়োগের মানদন্ড। এদেশে রাজনৈতিক পরিচয়ের বাইরে গিয়ে একজন শিক্ষার্থীকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পেতে অনেক বেগ পেতে হয়। এখানে শিক্ষকদের মধ্যে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতাকে এক ধরনের যোগ্যতা হিসেবে দেখা হয়। প্রশাসনিক নিয়োগেও একই অবস্থা। এর ফলে এদেশের উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সমূহে একটি স্বার্থান্বেষী শিক্ষক ও প্রশাসক গোষ্ঠীর আবির্ভাব ঘটেছে, যাদের ক্ষমতার উৎস ক্ষমতাবান বিশেষ করে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল।
ইতোমধ্যে বাংলাদেশের বিরোধী দলগুলোর অভিযোগ করেছে, ক্ষমতাসীন দল বিএনপি সরকারী প্রতিষ্ঠা সমূহে দলীয় বিবেচনায় প্রায় সকল নিয়োগ দান করছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতেও চলছে একই ব্যবস্থা। পরিস্থিতি যখন এমন, তখন আগামী দিনগুলোতে উচ্চশিক্ষা ক্ষেত্রেও ভালো কিছু প্রত্যাশা করা কঠিন। এক্ষেত্রে অভিজ্ঞ ও সচেতন মহলের পরামর্শ হচ্ছে, শিক্ষানীতিকে রাজনৈতিক ভেদাভেদের উর্ধে রাখার জন্য একটি রাজনৈতিক ঐকমত্যে পৌঁছাতে হবে। একটি জাতীয় ঐকমত্যভিত্তিক শিক্ষা কাঠামো তৈরী করতে হবে, যেখানে নীতির ধারাবাহিকতা থাকবে এবং পরিবর্তন আসবে, গবেষণা ও বাস্তব অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে। এক্ষেত্রে পরীক্ষামূলক প্রকল্প গ্রহণ করা যেতে পারে, যা সফল হলেই কেবল জাতীয় পর্যায়ে বাস্তবায়নে পদক্ষেপ নেয়া যাবে। এক্ষেত্রে ‘একদিন এক মডেল, পরের দিন আরেক মডেল’ গ্রহণের মতো নীতিগত অস্থিতিশীলতা দূর করতে হবে। এর বদলে গবেষণাভিত্তিক নীতি প্রণয়নের মধ্য দিয়ে শিক্ষানীতির সম্প্রসারণ ও বিস্তার ঘটাতে হবে। আর তা করা হলে এদেশের উচ্চ শিক্ষাকে উন্নত ও উন্নীত করা সম্ভব হবে বৈশ্বিক পরিসরে।


