নতুন সরকারের ১ম বাজেট : অসীম প্রত্যাশা ও সীমাহীন চ্যালেঞ্জ
প্রকাশিত হয়েছে : ০৭ জুন ২০২৬, ২:১১:১৫ অপরাহ্ন
অধিবেশন আজ শুরু
স্টাফ রিপোর্টার : রক্তঝরা গণঅভূত্থানের প্রায় দুই বছর পর দেশ এখন নির্বাচিত সরকারের অধীনে। এই সরকারের কাছে দেশের মানুষের প্রত্যাশার সীমানাও বিশাল। এমন বাস্তবতার মাঝে আজ শুরু হচ্ছে নতুন সরকারের প্রথম বাজেট অধিবেশন।
উচ্চ মূল্যস্ফীতি, রাজস্ব আহরণে ধীরগতি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যেই জাতীয় সংসদে উপস্থাপিত হতে যাচ্ছে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট। অর্থনীতিবিদ, ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা-এবারের বাজেট হবে বাস্তবমুখী, কর্মসংস্থানমুখী এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর।
আগামী ১১ জুন জাতীয় সংসদে বাজেট উপস্থাপন করবেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। বিএনপির নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকারের এটি প্রথম বাজেট, একই সঙ্গে অর্থমন্ত্রী হিসেবে আমীর খসরুরও প্রথম বাজেট উপস্থাপন। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা এবং প্রায় ২৩ লাখ কোটি টাকার সরকারি ঋণের চাপের মধ্যে সরকারকে এ বাজেট প্রণয়ন করতে হচ্ছে, যা স্বাভাবিকভাবেই বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। তবে চ্যালেঞ্জের পাশাপাশি রয়েছে ব্যাপক জন-প্রত্যাশাও।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট পেশ ও পাস করার লক্ষ্য নিয়ে আজ রোববার বিকেল ৩টায় এই সংসদীয় অধিবেশন আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হবে।
রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন সংবিধানের ৭২ অনুচ্ছেদের (১) দফায় প্রদত্ত বিশেষ ক্ষমতাবলে এই রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ অধিবেশন আহ্বান করেছেন।
সরকার সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বিপর্যস্ত অর্থনৈতিক অবস্থা থেকে উত্তরণ, বৈশ্বিক চাপ মোকাবিলা, দীর্ঘদিনের উচ্চ মূল্যস্ফীতি, জ্বালানি সংকট, বিনিয়োগে স্থবিরতা, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে ভারসাম্য আনয়ন, সংস্কার কার্যক্রম চালিয়ে নেওয়া এবং দুর্বল আর্থিক খাতের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার উচ্চাভিলাষী বাজেট পরিকল্পনা করেছে সরকার। যেখানে শুধু উচ্চাভিলাষী ব্যয়ই নয় একইভাবে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকার বিশাল রাজস্ব আয়ের পরিকল্পনাও করা হয়েছে।
তারপরও বাজেটে রেকর্ড পরিমাণ ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকার ঘাটতি থাকছে। এই ঘাটতি অর্থায়নে সরকারকে বরাবরের মতো বৈদেশিক ঋণ ও অভ্যন্তরীণ খাতের ওপর নির্ভর করতে হবে।
যেখানে চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটের আকার ধরা হয় ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি, সে হিসাবে এবার বাজেটের আকার বাড়ানো হচ্ছে ১ লাখ ৪৮ হাজার কোটি টাকা। শতকরা হিসাবে চলতি বাজেটের তুলনায় ১৮.৭৩ শতাংশ বেশি, যা ইতিহাসের রেকর্ড বৃদ্ধি।
অবশ্য সংকট মোকাবিলায় পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের আগে অন্তর্বর্তী সরকার আগের বছরের (২০২৪-২৫) তুলনায় ১০ হাজার কোটি টাকা কমিয়ে বাজেট ঘোষণা করেছিল, যা এখনো ধীরগতিতে বাস্তবায়নাধীন। আগামী বছরের বাজেটের প্রস্তুত করা সারসংক্ষেপের তথ্য বিশ্লেষণ করে এসব তথ্য পাওয়া গেছে। যা নিয়ে এরই মধ্যে অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সিরিজ বৈঠক করেছেন। তাঁর নির্দেশনা অনুযায়ীই বাজেটের এই সারসংক্ষেপ চূড়ান্ত করেছে অর্থবিভাগ।
সরকারের প্রস্তুত করা সর্বশেষ বাজেটের খসড়ায় মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত, অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার, উচ্চতর প্রবৃদ্ধি অর্জন, নির্বাচনি ইশতেহারের বাস্তবায়ন, সামাজিক সুরক্ষাজালের সম্প্রসারণ, কল্যাণকর অর্থনীতির ভিত্তি স্থাপনে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড কর্মসূচির বাস্তবায়ন এবং ব্যাপকভিত্তিক কর্মসংস্থান সৃষ্টিসহ ১৩টি ইস্যু সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারের জন্য চিহ্নিত করা হয়েছে। এর সঙ্গে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড কর্মসূচির বাস্তবায়ন নির্দিষ্ট এলাকায় শুরু করেছে সরকার, যা বিএনপির নির্বাচনি প্রতিশ্রুতির অংশ। এ খাতের অধীনে মোট ১ লাখ ৩৮ হাজার ৩৩৯ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করবেন অর্থমন্ত্রী। যা আগের বছরের তুলনায় অন্তত ১২ হাজার কোটি টাকা বেশি। এ ছাড়া এ খাতের আওতার সঙ্গে বাড়ানো হবে উপকারভোগীর সংখ্যাও। নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সংস্কার কার্যক্রম চলমান থাকবে বছরজুড়ে।
এবারের বাজেটের চিহ্নিত ৮টি চ্যালেঞ্জ হলো-মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, রাজস্ব সংগ্রহের কাঙ্খিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জন, চলমান কৃচ্ছ্রসাধন নীতি থেকে ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসা, গ্যাস-বিদ্যুৎ ও সারে প্রয়োজনীয় ভর্তুকির চাহিদা মিটিয়ে উন্নয়ন প্রকল্পে অর্থ সঞ্চালন, প্রকল্প বাস্তবায়নের গতি বৃদ্ধি করা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের প্রকল্প বাস্তবায়নে ধীরগতি- বিশেষ করে বৈদেশিক অর্থায়নের প্রকল্প গ্রহণের হার কমে আসা, অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক বিনিয়োগ বাড়াতে কাঠামোগত সংস্কার অব্যাহত রাখা ও বিনিয়োগ পরিবেশ আরও ব্যবসাবান্ধব রাখা, এবং ঋণ ধারণ সক্ষমতা বৃদ্ধি ও ঋণের স্থিতিশীলতা রক্ষায় রাজস্ব আদায় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি।
বিশ্বব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, এবারের বাজেটটা বিএনপির জন্য অনেক বেশি চ্যালেঞ্জিং। তবে সরকার এবার তাদের নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের প্রতিই বেশি জোর দেবে বলে তিনি মনে করেন।
এদিকে জানা গেছে, প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীও প্রথমবারের মতো বিকল্প বাজেট প্রস্তাবনা দিতে যাচ্ছে। দলটির কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী পরিষদ সদস্য ও সংসদ সদস্য সাইফুল আলম খান মিলন জানান, আগামী মাসে জামায়াতের পক্ষ থেকে একটি বিকল্প বাজেট প্রস্তাবনা দেওয়া হবে। এজন্য টেকনিক্যাল টিম কাজ করছে। আমরা সরকারকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করতে চাই এবং মনে করিয়ে দিতে চাই যে জনগণের কল্যাণে বাজেটে আর কী কী করা সম্ভব ছিল।
সংসদ সচিবালয় সূত্রে জানা গেছে, রাষ্ট্রপতির সুনির্দিষ্ট আদেশ জারির পর সংসদ সচিবালয়ের পক্ষ থেকে বাজেট অধিবেশনটি অত্যন্ত সুষ্ঠু, নির্বিঘ্ন ও যথাযথভাবে পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ও কারিগরি সকল প্রস্তুতি ইতিমধ্যে সম্পন্ন করা হয়েছে।





