বিচার কত দূর?
প্রকাশিত হয়েছে : ১৯ জুলাই ২০২৬, ৭:০৩:৩৩ অপরাহ্ন
তুরাবের ২য় শাহাদাতবার্ষিকী আজ

এমজেএইচ জামিল : ক্যালেন্ডারের পাতায় ফের ফিরেছে ভয়াল ১৯ জুলাই। শহীদ সাংবাদিক এটিএম তুরাবের শাহাদাতের ২ বছর পূর্ণ হলো আজ। ফ্যাসিবাদমুক্ত দেশে ২ বছরে অনেক কিছুরই পরিবর্তন হয়েছে। ক্ষমতার মসনদে বসেছে নির্বাচিত সরকার। সেই সরকারের মেয়াদও ৬ মাস হতে চলেছে। কেবল শেষ হয়নি তুরাব হত্যার বিচার। ২ বছরে অর্জন কেবল ২ জন আসামী গ্রেফতার আর তদন্ত।
প্রকাশ্য দিবালোকে শত শত মিডিয়ায় পুলিশের গুলি জলজ্যান্ত প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও এখনো তদন্তের দীর্ঘসূত্রিতায় আটকে আছে সিলেটের ইতিহাসে প্রথম পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে প্রকাশ্য দিবালোকে পুলিশের গুলিতে নিহত শহীদ সাংবাদিক তুরাব হত্যার বিচার। এদিকে দফায় দফায় তদন্তের নামে বিচারের দীর্ঘসূত্রিতার কারণে বিচার নিয়ে হতাশা বেড়েছে শহীদ পরিবারের সদস্যদের মাঝে। এ নিয়ে ক্ষুব্ধ সিলেটের সাংবাদিক সমাজ।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নগরীর ব্যস্ততম এলাকা কোর্টপয়েন্টে প্রকাশ্য দিবালোকে পুলিশের গুলীতে নিহত হন দৈনিক জালালাবাদের স্টাফ রিপোর্টার আবু তাহের মো. তুরাব (এটিএম তুরাব)। এরপর কেটে গেছে ২ বছর। এই সময়ে এসএমপির কোতোয়ালী থানা, পিবিআই হয়ে মামলাটি এখন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-আইসিটিতে। অপেক্ষা বাড়ছে বিচারের। মৃত্যুর আগে ছেলে হত্যার বিচার দেখে যেতে চান শহীদ তুরাবের মা, স্বামী হত্যার বিচার দেখতে চান বিয়ের ৩ মাসের মাথায় প্রিয়জনকে হারানো স্ত্রী ও তুরাবের ভাই-বোনেরা।
সেদিন কি ঘটেছিল : ১৯ জুলাই বাদ জুমআ নগরীর বন্দরবাজার এলাকায় ছাত্র-জনতার উপর নৃশংস গণহত্যার প্রতিবাদে মিছিল বের করে বিএনপি। তখন ন্যুনতম কোনো উত্তেজনা ছিলনা। নিত্যদিনের মতো সেদিনও সেখানে উপস্থিত ছিলেন সাংবাদিকগণ। পাশেই ছিল পুলিশের সশস্ত্র অবস্থান। হঠাৎই অতিউৎসাহী পুলিশ কর্মকর্তা এসএমপির তৎকালীন সহকারী কমিশনার সাদেক কাউসার দস্তগীরের মারমুখী আচরণে বদলে যায় পরিস্থিতি। উত্তপ্ত হয়ে উঠে কোর্ট পয়েন্ট এলাকা। ঐ পুলিশের কিলিং মিশনের টার্গেটে পড়ে যান সাংবাদিক এটিএম তুরাব। পুলিশের ছুঁড়া ৯৮টি ছররা গুলি বিদ্ধ হয় তুরাবের শরীরে। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাকে জরুরী ভিত্তিতে সোবহানীঘাটস্থ ইবনে সিনা হাসপাতালে প্রেরণ করা হয়। সেখানেই আইসিইউ-তে থাকা অবস্থায় সাংবাদিক তুরাব সন্ধ্যা ৬টা ৪০ মিনিটে মৃত্যুবরণ করেন।
তুরাবের ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক ও সিলেট ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ডা. শামসুল ইসলাম তখন জানিয়েছিলেন, তুরাবের শরীরে ৯৮টি ছররা গুলির চিহ্ন পাওয়া গেছে। গুলিতে তার লিভার ও ফুসফুস আঘাতপ্রাপ্ত হয়। মাথায়ও আঘাতের চিহ্ন ছিল। এ কারণেই তার মৃত্যু হয়ে থাকতে পারে।
মাত্র তিন মাস আগে লন্ডনি কইন্যা বিয়ে করেছিলেন সাংবাদিক এটিএম তুরাব। লন্ডন যাওয়ার সব প্রক্রিয়া এগিয়েও রেখেছিলেন। হয়তো কয়েক মাসের মধ্যে তার লন্ডন পাড়ি দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তার আগেই গুলিতে ঝাঁজরা হয়ে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করতে হয় তাকে। এমন ঘটনায় হতবাক হয়ে পড়ে তার পরিবার। লন্ডনে থাকা সদ্য বিবাহিতা স্ত্রী তানিয়া ইসলাম বিয়ের তিন মাসের মধ্যে হয়ে যান বিধবা। এখনো কাঁদেন তিনি। কারণ তখন দেশে ইন্টারনেট বন্ধ থাকায় স্বামীর মরদেহ ও শেষ বিদায়ের দৃশ্য দেখতে পারেননি তিনি। সাংবাদিক তুরাব হত্যার দুই বছর পেরিয়ে গেছে। ইতোমধ্যে তুরাব হত্যা মামলায় এসএমপির তৎকালীন এডিসি সাদেক কাউসার দস্তগীর ও পুলিশ কনস্টেবল উজ্জল সিংহ কারাগারে রয়েছেন। কিন্তু এসএমপির তৎকালীন ডিসি আজবাহার আলীসহ এজাহারভুক্ত অধিকাংশ আসামী এখনো বাইরে থাকায় ন্যায়বিচার নিয়ে পরিবার ও সহকর্মীদের মাঝে দেখা দিয়েছে সংশয়।
বিচার কত দূর : খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শহীদ সাংবাদিক এটিএম তুরাব হত্যার ঘটনায় মৃত্যুর ৫ দিনের মাথায় একই বছরের ২৪ জুলাই সাংবাদিক তুরাবের বড় ভাই আবুল আহসান মো. আজরফ (জাবুর) এসএমপির কোতোয়ালি মডেল থানায় আট থেকে ১০ জন পুলিশকে অভিযুক্ত করে এজাহার দাখিল করেন। কিন্তু কোতোয়ালি থানা পুলিশ সেটিকে মামলা হিসেবে গ্রহণ না করে জিডি হিসেবে নথিভুক্ত করে। এরপর সেই বছরের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে সরকার পতনের পর ১৯ আগস্ট সিলেটের অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আব্দুল মোমেনের আদালতে এটিএম তুরাব হত্যার ঘটনায় পুনরায় মামলা দায়ের করেন তার ভাই আবুল আহসান মো. আযরফ (জাবুর)। মামলায় সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীসহ ১৮ জনের নাম উল্লেখসহ ২০০-২৫০ জনকে অজ্ঞাত আসামি করা হয়েছে। আদালত শুনানি শেষে মামলার এফআইআর করার নির্দেশ দেন। মামলায় ২নং আসামি এসএমপির তৎকালীন উপকমিশনার (ক্রাইম উত্তর) মো. সাদেক দস্তগীর কাউসার, ৩নং আসামি তৎকালীন অতিরিক্ত উপ-কমিশনার আজবাহার আলী শেখ ও ৪নং আসামি হন কোতোয়ালী থানার তৎকালীন সহকারী কমিশনার মিজানুর রহমান।
এ মামলার অন্য আসামিরা হলেন- এসএমপির কোতোয়ালি মডেল থানার বন্দরবাজার ফাঁড়ির তৎকালীন ইনচার্জ কল্লোল গোস্বামী, থানার তৎকালীন ওসি মঈন উদ্দিন, ওসি (তদন্ত) ফজলুর রহমান, থানার এসআই কাজি রিপন সরকার, মহানগর স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি ও সিলেট সিটি করপোরেশনের (সিসিক) ৭নং ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর আফতাব উদ্দিন, জেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সহ-সভাপতি পিযূষ কান্তি দে, যুবলীগ নেতা ও সিসিকের তৎকালীন গণসংযোগ কর্মকর্তা সাজলু লস্কর, সিলেট সরকারি কলেজ ছাত্রলীগের সভাপতি ও সিসিকের ৩২নং ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর রুহেল আহমদ, জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক সজল দাস অনিক, নগরের চালিবন্দর নেহার মঞ্জিলের বাসিন্দা শিবলু আহমদ (মো. রুহুল আমিন), এসএমপির কনস্টেবল সেলিম মিয়া, কনস্টেবল আজহার, কনস্টেবল ফিরোজ ও কনস্টেবল উজ্জ্বল। এছাড়া মামলায় ২০০-২৫০ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামী করা হয়।
এদিকে দীর্ঘ দুই বছরে এই মামলায় দু’জন আসামি গ্রেফতার হলেও বাকিরা এখনো পলাতক। গেল বছর মামলাটি পুলিশ ব্যুরো ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) থেকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) কোর্টে স্থানান্তর করা হয়। আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালে মামলাটি স্থানান্তরের পর আইসিটি কোর্টের তদন্ত টীম দফায় দফায় সিলেট সফর করেন। তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন এবং সাক্ষীদের সাক্ষ্য নেন।
গেল বছরের ২০ জুলাই প্রথমবারের মতো তুরাব হত্যা মামলার দুই আসামীকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়। চাওয়া হয় রিমান্ড। গত বছরের আগস্টের মাঝামাঝি সময়ে চার্জশীট দাখিল করার কথাও জানিয়েছিলেন আইসিটি কোর্টের তৎকালীন তদন্ত কর্মকর্তাগণ। কিন্তু এরই মধ্যে পেরিয়ে গেছে আরও দুই বছর। সামনে চলে আসছে আরেক আগস্ট।
জানা গেছে, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) কোর্টের একটি তদন্ত টীম গত সপ্তাহে সিলেট সফর করে গেছেন। তারা তুরাব হত্যা মামলার সাক্ষীদের সাথে কথাও বলছেন।
এব্যাপারে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্তকারী কর্মকর্তা জসিম উদ্দিন দৈনিক জালালাবাদকে জানান, আমরা তদন্তের কাজে সিলেটে এসেছি। তুরাব হত্যা মামলার বাদি ও সাক্ষীদের সাথে কথা বলেছি। তবে তদন্ত সংশ্লিষ্ট কোন বিষয়ে মন্তব্য করতে অপরাগতা প্রকাশ করেন তিনি।
মামলার বাদী সাংবাদিক তুরাবের বড় ভাই আবুল আহসান মোহাম্মদ আজরফ (জাবুর) হতাশা ব্যক্ত করে বলেন, প্রকাশ্য দিবালোকে পুলিশের গুলিতে আমার ভাইকে হত্যা করা হলো। শত শত ফুটেজ, নিউজ ও প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষী থাকার পরও একের পর এক তদন্তের নামে কালক্ষেপনে আমরা বিচার নিয়ে হতাশ। প্রশাসন এখন পর্যন্ত মাত্র ২ জন আসামীকে গ্রেফতার করতে পেরেছে। অন্য আসামীদের গ্রেফতারে কোন তৎপরতা না থাকার বিষয়টি দুঃখনজক।






