নগরে অপরাধের গ্রাফ অস্থিতিশীল, উদ্বিগ্ন নাগরিক সমাজ
প্রকাশিত হয়েছে : ১৯ জুলাই ২০২৬, ৬:২৬:৩৬ অপরাহ্ন

মামুন পারভেজ: সিলেট নগরে চুরি, ছিনতাই, খুন ও রাহাজানিসহ অপরাধের সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলছে। সাম্প্রতিক আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির চিত্র অত্যন্ত উদ্বেগজনক রূপ নিয়েছে। জেলা ম্যাজিস্ট্রেট কার্যালয়ে জুনে অনুষ্ঠিত আইন-শৃঙ্খলা কমিটির মাসিক সভা ও মহানগর পুলিশের সংশ্লিষ্ট সূত্রে এ তথ্য জানা যায়।
সভার কার্যবিবরণী, জেলা ও মহানগর পুলিশ প্রশাসনের এপ্রিল ও মে মাসের অপরাধের তুলনামূলক পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, খুনের ঘটনা বৃদ্ধি পাওয়ার পাশাপাশি মাদক পাচার, চোরাচালান ও চুরির মতো অপরাধগুলোর প্রকোপ আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে জুন মাসে মামলার সংখ্যা কমেছে।
তৎকালীন সিলেটের জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মো. সারওয়ার আলমের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় আইন-শৃঙ্খলা কমিটির পক্ষ থেকে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, বিশেষ করে মে ২০২৬ মাসে গুরুতর অপরাধগুলোর সংখ্যা পূর্ববর্তী মাসের তুলনায় বৃদ্ধি পেয়েছে। মে ২০২৫ সালের তুলনায় মে ২০২৬ সালে সামগ্রিক মামলা ও ফৌজদারি অপরাধের নথিভুক্তির হার লক্ষণীয়ভাবে বেশি, যা প্রশাসনের কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণের জরুরী প্রয়োজনীয়তাকে নির্দেশ করে।
কার্যবিবরণী অনুযায়ী, চলতি বছরের সিলেট মহানগর এলাকায় এপ্রিল মাসে অপরাধের সংখ্যা ১৭৩টি। মে মাসে তা ১৮৩টি রেকর্ড করা হয়েছে। এদিকে গত বছরের মে মাসে অপরাধের সংখ্যা ছিল ১৩৪টি। চলতি বছরের এপ্রিল মাসের তুলনা মে মাসে মামলা বেড়েছে ১০টি। তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এগুলো রেকর্ডভুক্ত, এর বাইরে নানা অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে, অভিযোগ না থাকায় যা আইনের আওতায় আসছে না। অপরাধীর্ওা থেকে যাচ্ছে ধরাছোঁয়ার বাইরে।
সভায় উপস্থাপিত পুলিশ এবং জেলা প্রশাসনের এপ্রিল ও মে ২০২৬ মাসের অপরাধের বিবরণী পর্যালোচনা করে জানা যায়, চলতি বছরের এপ্রিলে মহানগর এলাকায় দস্যুতা ১, খুন ৩, দ্রুত বিচার আইন ৬, নারী ও শিশু নির্যাতন (ধর্ষণসহ) ৫, অপহরণ ১, পুলিশ আক্রান্ত ৩, সিঁধেল চুরি ৪, চুরি (গাড়ি, পশু ও অন্যান্য) ১৮, মাদকদ্রব্য আইন ৬০, চোরাচালান ২১, অস্ত্র আইন ১, বিস্ফোরক দ্রব্য আইন ১, চাঁদাবাজি ৭, অন্যান্য ৪২।
চলতি বছরের মে মাসে মহানগর এলাকায় ডাকাতি ২, খুন ৪, দ্রুত বিচার আইন ৭, নারী ও শিশু নির্যাতন (ধর্ষণসহ) ১৫, অপহরণ ১, পুলিশ আক্রান্ত ২, সিঁধেল চুরি ৩, চুরি (গাড়ি, পশু ও অন্যান্য) ২০, মাদকদ্রব্য আইন ৫৬, চোরাচালান ২২, জালিয়াতি ২, অন্যান্য ৪৯টি।
এদিকে, মে-২০২৬ মাসে এসএমপি’র অভিযানে ১৬৬৫ জন গ্রেপ্তার করা হয়। অভিযানে নিয়মিত মামলার আসামি ১৯২ জন, ছিনতাইকারী ৪২ জন, ওয়ারেন্টভুক্ত ১৯১ জন, মাদকসেবী ও মাদক ব্যবসায়ী ৯৯ জন, মেট্রো অধ্যাদেশে ৯৪৩ জন, চোর-ডাকাত ৫৬ জন, জুয়াড়ি ৫২ জন এবং হকার ৯০ জনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
এদিকে, জুন ২০২৬ মামলার সংখ্যা কমেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, জুনে সিলেট মহানগর এলাকায় মামলা রেকর্ড হয়েছে ১৫০টি। জুনে মহানগর এলাকায় দস্যুতা ২, খুন ১, দ্রুত বিচার আইন ৬, নারী ও শিশু নির্যাতন (ধর্ষণসহ) ৫, অপহরণ ৩, পুলিশ আক্রান্ত ৩, সিঁধেল চুরি ৬, চুরি (গাড়ি, পশু ও অন্যান্য) ১৬, মাদকদ্রব্য আইন ৪৪, অস্ত্র আইন ১, চাঁদাবাজি ৩, অন্যান্য ৫৩। গত জুন মাসে এসএমপি’র অভিযানে ২,৩২২ জন গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। অভিযানে ৭৪৪ জন মাদকসেবী ও মাদক কারবারি, ১৭৬ জন জুয়াড়ি, ২০ জন ছিনতাইকারী, ৩৬ জন চোর-ডাকাত, ২৬ জন অসামাজিক কর্মকা-ে জড়িত ব্যক্তি, ১৮৮ জন হকার, ১৮৯ জন ওয়ারেন্টভুক্ত আসামি, ৭২৫ জন মেট্রো অধ্যাদেশ ও সন্দেহভাজন ব্যক্তি এবং অন্যান্য আইনে ২১৮ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
এদিকে, সিলেট জেলায় এপ্রিলের তুলনায় মে মাসে অপরাধ কমছে। কার্যবিবরণীর তথ্যানুযায়ী, চলতি বছরের এপ্রিল মাসে অপরাধের সংখ্যা ছিল ২৩৩ এবং মে মাসে অপরাধের সংখ্যা ১৯৯। ২০২৫ সালে মে মাসে ২০৬টি মামলা রেকর্ড করা হয় সিলেট জেলায়।
নগরের রায়নগর এলাকার বাসিন্দা আশরাফুল ইসলাম অনি জানান, আজ (গতকাল) শনিবার ভোরে তাদের এলাকা (রায়নগর দর্জিবন্ধ) মসজিদের সামনে থেকে যাত্রী সেজে দুইজন ছিনতাইকারী সিএনজি চালিত অটোরিকশা চালককে মারধর করে গাড়ি (সিএনজি চালিত অটোরিকশা) ছিনতাই করে নিয়ে যায়। তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, আমরা সিসি ফুটেজে দেখেছি, ফজরের নামাজের পর একটি সিএনজি চালিত অটোরিকশা নিয়ে দুইজন আগন্তুক আসেন। মসজিদের সামনে গাড়ি থেকে চালককে নামতে দেখা যায়। পরে গাড়িতে থাকা যাত্রীর সঙ্গে চালকের দস্তাদস্তি শুরু হলে চালক-বাঁচাও, বাঁচাও চিৎকার করতে থাকেন। একপর্যায়ে চালককে মাটিতে ফেলে কিলঘুষি মেরে তারা সিএনজি অটোরিকশা নিয়ে পালিয়ে যায়। এ ঘটনায় থানায় অভিযোগ দেওয়া হয়েছে কিনা তিনি জানেন না বলে জানান। তবে আইনশৃঙ্খলার এমন অবনতিতে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, সিলেটে চুরি ছিনতাই আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। যেটা চিন্তার বিষয়।
নগরের শিবগঞ্জ এলাকার বাসিন্দা সোনালী যুব সংঘের সভাপতি নাজমুল আলম জানান, তাদের এলাকায় বেশ কয়েকটি চুরির ঘটনা সংঘটিত হয়েছে। তিনি বলেন, আমার বাসার এসির পাইপ ও তামার তার কেটে নিয়ে যায় চোর। এরপর কয়েকদিনের ব্যবধানে আরও একটি বাসায় এমন ঘটনা ঘটে। থানায় অভিযোগ দিয়েছিলেন কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, অভিযোগ দিয়ে কি হবে। আমরা কয়েকদিন আগে চোর ধরে থানায় দিয়েছি। এরপরদিনই দেখি অই চোর পাড়ায় ঘুরাঘুরি করছে। আইন শৃঙ্খলার অবনতি হচ্ছে দিন দিন।
সিলেট জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি অ্যাডভোকেট এমাদুল্লাহ শহীদুল ইসলাম শাহীন বলেন, আইন শৃঙ্খলা কমিটির সভায় বিগত বছরের ওই একই মাসে কি পরিমাণ অপরাধ সংঘটিক হয়েছে এবং চলতি বছরে কি পরিমাণ অপরাধ সংঘটিত হয়েছে তার তুলনামূলক পর্যালোচনা করা হয়। তুলনামূলক পর্যালোচনায় দেখা যায়, গত বছরের এপ্রিল ও মে মাসের তুলনা চলতি বছরে যেসব অপরাধ পুলিশের খাতায় নথিবদ্ধ তার সংখ্যা অনেক বেশি। সুতরাং বর্তমান প্রশাসনের উচিত এটাকে নিয়ন্ত্রণে আনা। কারণ, মানুষ প্রত্যাশা করেছিল ২০২৫ এর নির্বাচনের পর নতুন সরকার আসলে আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি হবে। তাছাড়া, বর্তমান সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ছিল আইন শৃঙ্খলার উন্নয়নটাকে তারা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিবে। আমাদেরও প্রত্যাশা ছিল আইন শৃঙ্খলার উন্নতি হবে। কিন্তু পরিসংখ্যান ও বাস্তব চিত্র বলছে ভিন্ন কথা। এটা আমাদের জন্য গভীর উদ্বেগের ব্যাপার।
তিনি আরও বলেন, ‘রেকর্ড হোক বা না হোক মহানগর এলাকায় আমরা দেখতে পাচ্ছি চুরি ছিনতাই রাহাজানি দিনে দিনে বেড়েই চলছে। এটা সিলেটের নাগরিকদের জন্য একটা উৎকন্ঠার ব্যাপার। আমরা দাবি জানাই, অপরাধ দমনে আইনশৃঙ্খলার কাজে নিয়োজিত বাহিনীসহ সবার কার্যক্রম যেন আগের থেকে বেশি হয়। সবার সম্মেলিত প্রচেষ্ঠার একটি সুখি নিরপাদ বাংলাদেশ গড়া সম্ভব।’
এ বিষয়ে জানতে সিলেট মহানগর পুলিশের (এসএমপি) অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (মিডিয়া) মো. মনজুরুল আলম বলেন, সিলেট নগরের সার্বিক আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নতির দিকেই আছে। পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, মে ২০২৬-এর তুলনায় জুন ২০২৬ মাসে সার্বিক অপরাধের হার উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে। চুরির মামলা ২০টি থেকে কমে ৬টিতে নেমে এসেছে। মে মাসে ২টি ডাকাতির ঘটনা থাকলেও জুন মাসে কোনো ডাকাতির ঘটনা ঘটেনি। হত্যার ঘটনা ৪টি থেকে কমে ১টিতে নেমে এসেছে।
তিনি আরও বলেন, সার্বিকভাবে, জুন ২০২৬ মাসে অপরাধ পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে এবং আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি মে মাসের তুলনায় অধিক নিয়ন্ত্রণে ছিল। এখানে দেখতে হবে, মাদক ্ও চোরাচালান মামলা বেশি হচ্ছে সেটা পজেটিভ সাইন। তার মানে মাদক চোরাইমাল আটক করা হচ্ছে। তার ঠিক উল্টোদিকে খুন ছিনতাইয়ের সখ্যাও তুলনামূলকভাবে কমেছে। এছাড়া, আজকে (রায়নগর) সকালের বিষয়ে আমার কাছে এখনও কোনো তথ্য আসেনি। তবে, আইন শঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে পুলিশ নিয়মিত অভিযান অব্যাহত রয়েছে।






