জুলাই গণঅভ্যুত্থানে গোলাপগঞ্জের ৭ শহীদ
প্রকাশিত হয়েছে : ০৫ আগস্ট ২০২৬, ১২:০৬:২২ অপরাহ্ন
নোমান মাহফুজ:

জুলাইয়ে স্বৈরাচারের বুলেটে রক্তে রঞ্জিত হয়েছিল আমাদের গোলাপগঞ্জ। মা-বাবা হারিয়েছেন বুকের মানিক। বোনেরা হারিয়েছেন প্রিয়তম স্বামী। আজ সেই শোকাবহ ৪ আগস্ট। পুলিশ-বিজিবি ও আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসীদের নিক্ষেপ করা গুলিতে গোলাপগঞ্জবাসী ৬ তাজা তরুণ ও যুবককে হারিয়েছেন। ৬টি পরিবারের সন্তান হারানোর, বাবা হারানোর, স্বামী হারানোর, ভাই হারানোর শোকাবহ দিন। আজ গোলাপগঞ্জের জন্য একটি কালো অধ্যায়।
নিহতদের পরিবারের পক্ষ থেকে গোলাপগঞ্জ মডেল থানা ও সিলেট কোর্টে একাধিক মামলা করা হলেও এখনো কোনো মামলার চূড়ান্ত চার্জশিট বা বিচার কার্যক্রম শুরু হয়নি। যদিও ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটররা দুইবার গোলাপগঞ্জে এসে তদন্ত করে গেছেন। আজকের দিনে গোলাপগঞ্জবাসীর দাবি, হত্যাকাণ্ডের পেছনে যারাই রয়েছে, তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদানের মাধ্যমে শহীদদের স্মৃতি চিরজাগরুক রাখা হোক।
ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার সরকার পতনের দুই বছর। অভ্যুত্থানে সিলেটের শহীদদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি গোলাপগঞ্জ উপজেলায়। সেখানে ৪ আগস্টেই প্রাণ হারান ছয়জন। আর সরকার পতনের দিন অর্থাৎ ৫ আগস্টেও পুলিশের গুলিতে একজন শহীদ হন। নির্মম হত্যাযজ্ঞের দুই বছর পেরিয়ে গেলেও স্বজন হারানোর বেদনা এখনো ভুলতে পারেনি তাদের পরিবার। ন্যায়বিচার পাওয়ার শঙ্কা আর আক্ষেপ নিয়েই কাটছে শহীদ পরিবারগুলোর দিন।
উত্তাল দেশ। উত্তাল ছাত্র-জনতা। ক্ষোভে-ঘৃণায় ফুঁসছে প্রতিটি মানুষের হৃদয়। ২০২৪ সালের ৫ জুন থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত অগণিত প্রাণ বিসর্জনের মধ্য দিয়ে ১৬ বছরের স্বৈরাচারী শাসনের অবসান ঘটিয়েছে ছাত্র-জনতা। জুলাই বিপ্লব নামে পরিচিত ছাত্র-জনতার আন্দোলন বাংলাদেশে একটি গণতান্ত্রিক গণঅভ্যুত্থান। ঐতিহাসিক এই বিপ্লবের বিজয়ের ধারার সূচনা হয়েছিল সরকারি চাকরিতে কোটা পদ্ধতি বাতিলের দাবির আন্দোলনের মধ্য দিয়ে। এটি পরে সরকারের কঠোর অবস্থানের কারণে আরও প্রবল হয়ে ওঠে, যা ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট চূড়ান্ত রূপ লাভ করে। প্রায় ১,৪০০ মানুষকে হত্যার প্রেক্ষাপটে বিগত প্রায় ১৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে দেশ শাসনের পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে ভারতে পালিয়ে যান।
৪ আগস্ট উপজেলা প্রশাসন ১৪৪ ধারা জারি করেন। অন্যদিকে গোলাপগঞ্জের ছাত্র-জনতা ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে সমগ্র দেশের ন্যায় গোলাপগঞ্জের উপজেলা সদর, ঢাকাদক্ষিণ বাজার, ভাদেশ্বরসহ বড় বড় বাজারে আন্দোলনের জন্য অবস্থান নেন। ৪ আগস্ট সকাল আনুমানিক ৯টার দিকে উপজেলার ঢাকাদক্ষিণ বাজারে বিজিবির একটি টহল দল নোহা গাড়ি নিয়ে টহল দেওয়ার সময় ছাত্র-জনতার আন্দোলনে বাধা দেয়। উত্তপ্ত হয়ে ওঠেন ছাত্র-জনতা। হামলা চালানো হয় বিজিবির ব্যবহৃত নোহা গাড়িতে। আত্মরক্ষার্থে বিজিবি টিয়ার গ্যাস ও রাবার বুলেট নিক্ষেপ করে। এতে পরিস্থিতি আরও ঘোলাটে হয়ে ওঠে ঢাকাদক্ষিণ বাজার। পরে বিজিবি-পুলিশ আন্দোলনকারীদের লক্ষ্য করে রাবার বুলেটের পাশাপাশি স্প্রিং বুলেট নিক্ষেপ করতে থাকে। শত শত ছাত্র-জনতা আহত হতে থাকেন। এতে ছাত্রদের আন্দোলনে এলাকার মানুষজন ও অভিভাবকরাও জড়িয়ে পড়ে পুলিশ-বিজিবি ও আওয়ামী লীগ ক্যাডারদের ধাওয়া করতে শুরু করেন। তীব্র হয়ে ওঠে গোলাপগঞ্জের ঢাকাদক্ষিণ বাজারের ছাত্র-জনতার আন্দোলন। পাল্টা ধাওয়া ও গুলি ছুড়তে থাকে বিজিবি। এতে শতাধিক ছাত্র-জনতা আহত ও রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে থাকলে স্থানীয়রা এবং ছাত্র-জনতা ঢাকাদক্ষিণ বাজারে বিজিবি ও পুলিশকে ঘেরাও করে ফেলেন।
বিজিবি পালিয়ে গোলাপগঞ্জের দিকে আসার সময় মাঝপথে বারকোট ও ধারাবহর এলাকায় গোলাপগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সামনে স্থানীয় জনতা রাস্তা ব্যারিকেড দিয়ে এলাকার মসজিদে মাইকিং করতে থাকেন। পরে স্থানীয়রা যে যা পেয়েছেন তা নিয়ে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সামনে সিলেট-ঢাকাদক্ষিণ সড়ক বন্ধ করে পুলিশ-বিজিবিকে ঘেরাও করে ফেলেন। পরিস্থিতি ভয়াবহ দেখে ও আত্মরক্ষার্থে বিজিবি সরাসরি গুলি নিক্ষেপ করতে থাকে। এতে ঘটনাস্থলেই নিহত হন তাজ উদ্দিন, নাজমুল ইসলাম ও সানি আহমদ। আহত হন জয় আহমদসহ প্রায় ১৫ থেকে ২০ জন। গুরুতর অবস্থায় জয় আহমদকে সিলেটের বেসরকারি ইবনে সিনা হাসপাতালে ভর্তি করার কিছুক্ষণ পরই তিনি মারা যান।
উপজেলার বারকোট এলাকায় তিনজন ঘটনাস্থলে নিহত এবং সিলেটে হাসপাতালে নেওয়ার পর আরও একজন নিহত হওয়ার বিষয়টি চারদিকে ছড়িয়ে পড়লে গোলাপগঞ্জ উপজেলা সদর আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। ছাত্র-জনতা গোলাপগঞ্জ সরকারি মোহাম্মদ চৌধুরী একাডেমির সামনে থেকে বিজিবি ও পুলিশের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে এগিয়ে আসেন। অপরদিকে ধারাবহর ও বারকোট এলাকা থেকে বিজিবিকে ধাওয়া করতে থাকেন। বিজিবি-পুলিশ গুলি ছুড়ে আত্মরক্ষার্থে গোলাপগঞ্জ উপজেলা পরিষদে আশ্রয় নেয়। সেখানে প্রায় তিন ঘণ্টা অবরুদ্ধ থাকার পর সেনাবাহিনী ও পুলিশের সহায়তায় বিজিবি ও অবরুদ্ধ পুলিশ সদস্যদের উপজেলা পরিষদ থেকে উদ্ধার করে নিয়ে যাওয়া হয়।
এক পর্যায়ে ছাত্র-জনতা গোলাপগঞ্জ মডেল থানা ঘেরাওসহ মিছিল শুরু করেন। উক্ত মিছিল ও থানা ঘেরাও ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ ও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা ছাত্র-জনতার ওপর ফের হামলা ও গুলি চালায়। এ সময় তাদের ছোড়া গুলিতে ঘটনাস্থলেই নিহত হন গৌছ উদ্দিন ও মিনহাজ আহমদ। পরিস্থিতি সামাল দিতে বিজিবি-পুলিশ ও সেনাবাহিনী ছাত্র-জনতার ওপর আরও কঠোর হয়। পরিস্থিতির অবনতি দেখে ছাত্র-জনতা দিকবিদিক ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়েন। এ সময় অনেকেই গুলিবিদ্ধ হন। আহতদের গোলাপগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও সিলেট শহরের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়।
৪ আগস্ট বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনে গোলাপগঞ্জের ৬ শহীদের দ্বিতীয় শাহাদাতবার্ষিকী। গোলাপগঞ্জবাসীর জন্য এটি এক শোকাবহ দিন। আজও নিহতদের পরিবারের কান্না থামেনি। প্রতিটি পরিবারে সন্তানহারা বেদনা আর আহাজারিতে চোখের জলে ভেসে যায়। আজ ৪ আগস্ট হওয়ায় নিহতদের পরিবারের জন্য দিনটি আরও বেদনাদায়ক হয়ে উঠেছে।
জুলাই অভ্যুত্থানে গোলাপগঞ্জের নিহত সাতজন হলেনÑ লক্ষণাবন্দ ইউনিয়নের নিশ্চিন্ত গ্রামের মৃত তৈয়ব আলীর ছেলে নাজমুল ইসলাম (২৪), একই ইউনিয়নের দক্ষিণ রায়গড় গ্রামের মৃত ছুরাই মিয়ার ছেলে জয় আহমদ (১৮), পশ্চিম আমুড়া শিলঘাট গ্রামের কয়ছর আহমদের ছেলে সানি আহমদ (২২), ঢাকাদক্ষিণ ইউনিয়নের বারকোট গ্রামের মৃত মকবুল আলীর ছেলে তাজ উদ্দিন (৩৯), একই ইউনিয়নের দত্তরাইল গ্রামের আলা উদ্দিনের ছেলে মিনহাজ আহমদ (২৩), পৌর এলাকার উত্তর ঘোষগাঁও গ্রামের মোবারক আলীর ছেলে গৌছ উদ্দিন (৩৫) এবং কানিশাইল গ্রামের কামরুল ইসলাম পাবেল (২৩)।





