সিলেটের ১৫ হত্যা মামলায় নেই কাঙ্খিত অগ্রগতি
প্রকাশিত হয়েছে : ০৫ আগস্ট ২০২৬, ১২:৫৭:৪৩ অপরাহ্ন
দুই বছরেও খোঁজ মেলেনি শাহজাহানের লাশের

এমজেএইচ জামিল: ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের দুই বছর পূর্ণ হলেও সিলেটে নিহত সাংবাদিক এটিএম তুরাবসহ ১৫ শহীদের হত্যা মামলার বিচারপ্রক্রিয়ায় নেই কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি। এরই মধ্যে একটি মামলা আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে। কিন্তু সিআইডি, পিবিআই, সিলেট জেলা ও মহানগর পুলিশের কাছে থাকা বাকি ১৪টি মামলার তদন্তে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি নেই। একই সময়ে গণঅভ্যুত্থানের সময় নিখোঁজ হওয়া সিএনজিচালক শাহজাহানের লাশও দুই বছরেও উদ্ধার হয়নি।
ফলে শহীদ পরিবারের পাশাপাশি অনিশ্চয়তা ও অপেক্ষার মধ্যে রয়েছে নিখোঁজ শাহজাহানের পরিবারও। স্বজনদের অভিযোগ, মামলা হয়েছে, তদন্তের কথা বলা হয়েছে; কিন্তু দুই বছর পরও হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটন এবং দায়ীদের আইনের আওতায় আনার ক্ষেত্রে দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই।
সিলেটের ১৫ শহীদের আত্মদান:
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আন্দোলনে সিলেটে ১৯ জনের প্রাণহানি হলেও তথ্য প্রমাণের ভিত্তিতে ১৫ জনের প্রাণহানির ঘটনায় মামলা হয়েছে। জানা গেছে, ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই সিলেট নগরীতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় পুলিশ ও ছাত্রলীগ-যুবলীগ-স্বেচ্ছাসেবক লীগের হামলা ও ধাওয়ায় আত্মরক্ষার্থে পালাতে গিয়ে নগরীর একটি ছড়ার পানিতে ডুবে নিহত হন শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী রুদ্র সেন।
পরদিন ১৯ জুলাই নগরীর কোর্ট পয়েন্ট এলাকায় পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে পুলিশের গুলিতে শহীদ হন দৈনিক জালালাবাদের স্টাফ রিপোর্টার এটিএম তুরাব। একই দিনে রাজধানীর বাড্ডায় নিহত হন সিলেট সদর উপজেলার কান্দিগাঁও ইউনিয়নের ইনাতাবাদ গ্রামের ওয়াসিম।
২০ জুলাই নারায়ণগঞ্জে নিহত হন সিলেটের বিয়ানীবাজার উপজেলার চারখাই ইউনিয়নের কাকুরা গ্রামের সোহেল আহমদ। এরপর ২ আগস্ট হবিগঞ্জ সদর এলাকায় নিহত হন সিলেট সদর উপজেলার টুকেরবাজার ইউনিয়নের ঘোপাল গৌরীপুর গ্রামের মোস্তাক আহমদ।
৪ আগস্ট গোলাপগঞ্জে একদিনেই প্রাণ হারান ছয়জন। তারা হলেন- পশ্চিম আমুড়া ইউনিয়নের শিলঘাট গ্রামের সানি আহমদ, লক্ষণাবন্দ ইউনিয়নের নিশ্চিন্ত গ্রামের নাজমুল ইসলাম, ঘোষগাঁও উত্তরের মোবারকের বাড়ির গৌছ উদ্দিন, ঢাকা দক্ষিণের পশ্চিম দত্তরাইলের মিনহাজ আহমদ, ঢাকা দক্ষিণের দক্ষিণ রায়গড়ের রজয় আহমদ এবং ঢাকা দক্ষিণের বারকোট গ্রামের তাজ উদ্দিন।
গণঅভ্যুত্থানের চূড়ান্ত পর্যায়ে ৫ আগস্ট সিলেট মহানগর এলাকায় নিহত হন গোলাপগঞ্জ উপজেলার ঢাকা দক্ষিণ-উত্তর কানিশাইল এলাকার পাবেল আহমদ কামরুল। একই দিনে বিয়ানীবাজারে নিহত হন বিয়ানীবাজার পৌরসভার নয়াগ্রামের রায়হান উদ্দিন, মোল্লাপুর নিদনপুরের তারেক আহমদ এবং নয়াগ্রামের ময়নুল ইসলাম।
এই ১৫ জনের স্বজনদের কাছে দুই বছর পরও স্বজন হারানোর ক্ষত যেমন তাজা, তেমনি তাদের অধিকাংশের হত্যা মামলার দৃশ্যমান অগ্রগতি না থাকায় ন্যায়বিচার পাওয়া নিয়েও তৈরি হয়েছে গভীর অনিশ্চয়তা।
দুই বছরেও লাশের খোঁজ মেলেনি শাহজাহানের:
গণঅভ্যুত্থানের দুই বছর পূর্ণ হলেও সিএনজিচালক শাহজাহানের সন্ধান আজো মেলেনি। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সহিংসতার পর থেকে তিনি নিখোঁজ হন। দীর্ঘ দুই বছর ধরে তার পরিবার অপেক্ষা করছে- তিনি জীবিত আছেন কি না, কিংবা তার পরিণতি কী হয়েছে, তার কোনো নিশ্চিত তথ্য এখনো মেলেনি। পরিবারের দাবি, শাহজাহান ওই দিন সিএনজিচালক হিসেবে বের হওয়ার পর আর ফিরে আসেননি। তার ব্যবহৃত সিএনজিচালিত অটোরিকশার সন্ধান মিললেও তার লাশ পাওয়া যায়নি। এরপর বিভিন্ন স্থানে খোঁজ করেও কোনো সন্ধান মেলেনি।
শাহজাহানের স্বজনদের কাছে এটি এখন শুধু নিখোঁজের ঘটনা নয়, বরং দুই বছর ধরে চলা এক অসহনীয় অপেক্ষা। তারা তার সন্ধান এবং ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত দাবি করেছেন।
শাহজাহানের নাম গণঅভ্যুত্থানে নিহতদের গেজেটে অন্তর্ভুক্তির প্রক্রিয়ায় রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। তবে লাশ উদ্ধার না হওয়ায় তার পরিবারের কাছে ঘটনাটি এখনো রহস্যে ঘেরা।
তুরাবের মামলা আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালে:
২০২৪ সালের ১৯ জুলাই নগরীর কোর্ট পয়েন্ট এলাকায় পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে পুলিশের গুলিতে নিহত হন সাংবাদিক এটিএম তুরাব। এ ঘটনায় দায়ের করা হত্যা মামলা বর্তমানে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে তদন্তাধীন।
মামলায় এসএমপির সাবেক অতিরিক্ত উপ-কমিশনার সাদেক কাউসার দস্তগীর ও পুলিশ কনস্টেবল উজ্জল সিনহা গ্রেফতার হয়ে কারাগারে রয়েছেন। তাদের জিজ্ঞাসাবাদও করা হয়েছে। তবে মামলার বাদীপক্ষের অভিযোগ, হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত অন্যদের এখনো আইনের আওতায় আনা হয়নি।
তুরাবের পরিবারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, প্রকাশ্য দিবালোকে পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে গুলি করে হত্যা করা হলেও দুই বছরেও তারা পূর্ণাঙ্গ বিচার পাননি। হত্যাকাণ্ডে জড়িত সব ব্যক্তিকে শনাক্ত করে বিচারের মুখোমুখি করার দাবি তাদের।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্তসংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, তুরাব হত্যা মামলার তদন্তে অগ্রগতি হয়েছে। প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করা হয়েছে এবং তদন্ত শেষে অভিযোগপত্র দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে।
রুদ্রের মামলা সিআইডিতে:
২০২৪ সালের ১৮ জুলাই সিলেট নগরীতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় ধাওয়া ও সংঘর্ষের মধ্যে ছড়ার পানিতে ডুবে মারা যান শাবিপ্রবি শিক্ষার্থী রুদ্র সেন। তার হত্যা মামলা বর্তমানে সিআইডিতে তদন্তাধীন।
সিআইডির তদন্ত কর্মকর্তা জানিয়েছেন, মামলার তদন্তে অগ্রগতি হয়েছে। তবে তদন্তের স্বার্থে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা সম্ভব নয়। চার্জশিট দিতে আরও সময় প্রয়োজন বলেও তিনি জানিয়েছেন।
তবে দুই বছরেও এ মামলায় কোনো আসামি গ্রেফতারের খবর পাওয়া যায়নি।
বাকি ১৩ মামলাও থমকে:
সিলেট জেলা ও মহানগর পুলিশের কাছে থাকা ১৩টি হত্যা মামলার তদন্ত নিয়েই সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন উঠেছে। নিহতদের স্বজনদের অভিযোগ, মামলা দায়েরের পর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও তদন্তের দৃশ্যমান অগ্রগতি তারা দেখতে পাচ্ছেন না।
সিলেট জেলার গোলাপগঞ্জ ও বিয়ানীবাজার থানায় মোট ১০টি এবং মহানগর পুলিশের বিভিন্ন থানায় চারটি মামলা দায়ের করা হয়েছিল। এর মধ্যে তুরাবের মামলা আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে এবং রুদ্রের মামলা সিআইডিতে স্থানান্তর হওয়ায় জেলা ও মহানগর পুলিশের কাছে রয়েছে ১৩টি মামলা। যদিও জেলা ও মহানগর পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে অধিকাংশ মামলা সিআইডি ও পিবিআইতে স্থানান্তর করা হয়েছে। ফলে সেগুলোর ব্যাপারে তাদের কাছে কোন তথ্য নেই।
জেলা পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, জেলার ১১টি মামলার মধ্যে ৮টি সিআইডি ও পিবিআইতে স্থানান্তর করা হয়েছে। ৩টি মামলা জেলা পুলিশের হাতে রয়েছে। সেগুলোর তদন্ত কাজ চলমান রয়েছে।
এসএমপি সূত্রে জানা গেছে, মহানগর পুলিশের কাছে ১টি মামলা রয়েছে। বাকী ৪টির মধ্যে তুরাব হত্যা মামলা আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে রুদ্র সেন হত্যা মামলা সিআইডিতে, কামরুল হত্যা মামলা আদালতে চুড়ান্ত প্রতিবেদনের পথে রয়েছে। শুধু পংকজ কুমার হত্যা মামলা এসএমপির কাছে রয়েছে।
পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, কিছু মামলায় সুরতহাল, ময়নাতদন্তসহ প্রয়োজনীয় নথির ঘাটতির কারণে তদন্ত এগিয়ে নিতে জটিলতা রয়েছে। পাশাপাশি তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় তদন্ত কার্যক্রম চলমান রয়েছে। কিন্তু দুই বছরেও এসব মামলায় দৃশ্যমান ফল না আসায় নিহতদের পরিবারে হতাশা বাড়ছে। তাদের প্রশ্ন—গণঅভ্যুত্থানে প্রাণ দেওয়া মানুষগুলোর হত্যার বিচার যদি দুই বছরেও দৃশ্যমান পর্যায়ে না আসে, তাহলে ন্যায়বিচার নিশ্চিত হবে কবে?
পরিবারের অপেক্ষা:
গণঅভ্যুত্থানের দুই বছর পূর্তিতে সিলেটের শহীদ পরিবারগুলোর দাবি, রাজনৈতিক পরিচয় বা প্রভাব বিবেচনা না করে প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের নিরপেক্ষ তদন্ত করতে হবে। হত্যার সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত সবাইকে শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে হবে।
আর শাহজাহানের পরিবারের দাবি আরও মৌলিক-দুই বছর ধরে নিখোঁজ তাদের স্বজনের অন্তত পরিণতি নিশ্চিত করা হোক। জীবিত থাকলে তাকে খুঁজে বের করা, আর মারা গেলে লাশ উদ্ধার করে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হোক।
গণঅভ্যুত্থানের দুই বছর পর সিলেটের শহীদ পরিবারগুলোর কাছে তাই প্রশ্ন একটাই-মামলা, তদন্ত ও প্রতিশ্রুতির পর বিচার ও সত্যের দেখা মিলবে কবে?
এ ব্যাপারে সিলেটের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অবস) মো. জাকির হোসাইন বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ঘটনায় জেলা পুলিশের অধীনে বিভিন্ন থানায় ১১টি হত্যা মামলা হয়েছে। এর মধ্যে ৬টি মামলা সিআইডিতে এবং ২ টি মামলা পিবিআইতে তদন্তাধিন আছে। জেলা পুলিশের কাছে ৩টি মামলা রয়েছে। এরমধ্যে ২টা গোলাপগঞ্জ ও ১টা বিয়ানীবাজার থানায়। সেগুলোর তদন্ত কাজ এখনো চলমান রয়েছে।
সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম জানান, সিলেট নগর এলাকায় ৪টি মামলার মধ্যে ১টি এসএমপির কাছে আছে। বাকী ১টি মামলা আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে, ১টি পিবিআইতে ও ১টি সিআইডিতে আছে। একটি মামলার কাজ পিবিআই-সিআইডি হয়ে বর্তমানে আদালতে রয়েছে।






