২৫ বছরের যুদ্ধে নিহত ৪৫ লাখ : বাস্তুচ্যুত ৩ কোটি ৮০ লাখ
প্রকাশিত হয়েছে : ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৮:০৩:৪৫ অপরাহ্ন
জালালাবাদ রিপোর্ট : একটি হামলার পর শুরু হয়েছিল যে ‘সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ’, ২৫ বছর পর তার হিসাব দাঁড়িয়েছে লাখো মৃত্যু, কোটি মানুষের বাস্তুচ্যুতি আর অসংখ্য পরিবারের অপূরণীয় ক্ষত হিসেবে। আফগানিস্তান ও ইরাকের যুদ্ধ থেকে শুরু করে লিবিয়া, সিরিয়া, ইয়েমেন ও সোমালিয়ায় বিমান ও ড্রোন হামলা, যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে পরিচালিত এসব সামরিক অভিযানে সরাসরি ও পরোক্ষভাবে প্রাণ গেছে আনুমানিক ৪৫ লাখ থেকে ৪৭ লাখ মানুষের। ঘর হারিয়েছেন তিন কোটি ৮০ লাখের বেশি।
আল জাজিরা বলছে, ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর আল-কায়েদার ১৯ জন সদস্য চারটি বাণিজ্যিক বিমান ছিনতাই করে নিউইয়র্কের ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার ও পেন্টাগনে হামলা চালায়। এতে প্রায় তিন হাজার মানুষ নিহত হন।
এর এক মাসেরও কম সময় পর আফগানিস্তানে হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র। তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশের ভাষায়, শুরু হয় ‘সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ’। এরপর আফগানিস্তান, ইরাক এবং মধ্যপ্রাচ্য, দক্ষিণ এশিয়া ও আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে একের পর এক সামরিক অভিযান চালানো হয়। ২০০১ সালের পর থেকে প্রায় প্রতি বছরই বিশ্বের কোনো না কোনো দেশে মার্কিন বাহিনী বোমা হামলা চালিয়েছে।
২০০৩ সালে ইরাকে মার্কিন আগ্রাসনের সময় ১৮ বছরের শিক্ষার্থী ছিলেন ওমর। তিনি আল জাজিরাকে বলেন, সবকিছু বদলে গিয়েছিল।’ ব্যাপক ধ্বংসাত্মক অস্ত্র (ডব্লিউএমডি) থাকার মিথ্যা অভিযোগের ভিত্তিতে ইরাকে যুদ্ধ শুরু করা হয়েছিল বলে স্মরণ করেন তিনি।
‘সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধে’ নিহত ৪৫ লাখের বেশি :
ব্রাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়াটসন ইনস্টিটিউট ফর ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড পাবলিক অ্যাফেয়ার্সের ‘কস্ট অব ওয়ার’ প্রকল্পের হিসাব অনুযায়ী, ২০০১ সালের পর যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে পরিচালিত যুদ্ধগুলোতে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে আনুমানিক ৪৫ লাখ থেকে ৪৭ লাখ মানুষ নিহত হয়েছেন।
এর মধ্যে প্রায় নয় লাখ ৪০ হাজার মানুষ সরাসরি যুদ্ধের কারণে মারা গেছেন। আর রোগ, অপুষ্টি ও স্বাস্থ্যগত জটিলতার মতো যুদ্ধের পরোক্ষ প্রভাবে প্রাণ হারিয়েছেন ৩৬ লাখ থেকে ৩৮ লাখ মানুষ।
আফগানিস্তানে সরাসরি নিহত এক লাখ ৭৬ হাজার
২০০১ সালের ৭ অক্টোবর আফগানিস্তানে ‘অপারেশন এন্ডিউরিং ফ্রিডম’ শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র। কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই তালেবান সরকারের পতন হলেও যুদ্ধ শেষ হয়নি। চার মার্কিন প্রেসিডেন্টের সময়জুড়ে প্রায় ২০ বছর ধরে চলা এই সংঘাত যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘ যুদ্ধ হয়ে ওঠে।
কস্ট অব ওয়ার প্রকল্পের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, আফগানিস্তানে সরাসরি যুদ্ধের কারণে আনুমানিক এক লাখ ৭৬ হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন। ক্ষুধা, রোগ ও চিকিৎসার অভাবে আরও কয়েক লাখ মানুষ মারা যান।
যুদ্ধের আগে আফগানিস্তানের ৬২ শতাংশ মানুষ খাদ্যনিরাপত্তাহীনতায় ভুগতেন। যুদ্ধের পর এই হার বেড়ে ৯২ শতাংশে দাঁড়ায়। অবিস্ফোরিত গোলাবারুদ ও স্থলমাইন এখনো বেসামরিক মানুষের মৃত্যু ও পঙ্গুত্বের কারণ হয়ে আছে। ২০২১ সালে আবারও আফগানিস্তানের নিয়ন্ত্রণ নেয় তালেবান।
ইরাকে সরাসরি নিহত তিন লাখ ১৫ হাজার :
এর দুই বছরেরও কম সময় পর, ২০০৩ সালের ১৯ মার্চ ইরাকে আগ্রাসন শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র। যুদ্ধ শুরুর সময় ওমরের বয়স ছিল ১৮ বছর। তিনি বলেন, ‘আমরা বোমার শব্দ মনে করতে পারি। আমরা খুব ভয় পেয়েছিলাম।
বাগদাদে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ার পর কী ঘটছে তা দেখতে তার কয়েকজন বন্ধু বাইরে গিয়েছিলেন। বিপদ সম্পর্কে সতর্ক করা সত্ত্বেও তারা বের হন।
ওমর বলেন, আমি তাদের বলেছিলাম, তোমরা কেন যাচ্ছ? এরপর তারা গেল, কিন্তু আর ফিরে আসেনি। আমরা যখন সেসব কথা মনে করি, খুব কষ্ট হয়।
বাস্তুচ্যুত তিন কোটি ৮০ লাখের বেশি :
কস্ট অব ওয়ার প্রকল্পের হিসাব অনুযায়ী, ৯/১১ পরবর্তী যুদ্ধের কারণে আফগানিস্তান, ইরাক, পাকিস্তান, ইয়েমেন, সোমালিয়া, ফিলিপাইন, লিবিয়া ও সিরিয়ায় তিন কোটি ৮০ লাখের বেশি মানুষ নিজ দেশ বা দেশের বাইরে বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। দুই দশকের বেশি সময় পরও বহু মানুষকে ঘরবাড়ি ছাড়তে হচ্ছে।
গত বছর ইরান ও পাকিস্তান প্রায় ২৯ লাখ আফগানকে সীমান্ত পেরিয়ে নিজ দেশে ফিরে যেতে বাধ্য করে। ইরাকে মার্কিন আগ্রাসনের দুই দশক পরও ১০ লাখের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত অবস্থায় রয়েছেন।
৪০ বছর বয়সী আফগান নারী আয়েশা জীবনের বড় একটি সময় আফগানিস্তান ও ইরানের মধ্যে বাস্তুচ্যুত হয়ে কাটিয়েছেন। ১৯৯৪ সালে তার পরিবার প্রথমবার আফগানিস্তান ছেড়ে যায়। ২০০০ সালে ফিরে এলেও ২০০২ সালে মার্কিন আগ্রাসনের পর আবার দেশ ছাড়তে হয়।
ইরানে ১১ বছর থাকার পর তাকে ও তার সন্তানদের বহিষ্কার করা হয় এবং আফগানিস্তানে ফিরে যেতে বাধ্য করা হয়।






