বড় ঝুঁকিতে অর্থনীতি রপ্তানি হারানোর শঙ্কা
প্রকাশিত হয়েছে : ০৩ নভেম্বর ২০২৬, ৬:৫৩:০০ অপরাহ্ন
জালালাবাদ রিপোর্ট: তৈরি পোশাকশিল্পে শ্রমিক অসন্তোষ জটিল আকার নিয়েছে। ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধি, চাকরির নিরাপত্তা, ছাঁটাই বন্ধ ও চাকরিচ্যুত শ্রমিকদের পুনর্বহালসহ বিভিন্ন দাবিতে সাভার-আশুলিয়া ও গাজীপুরের শিল্পাঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে বিক্ষোভ, সংঘর্ষ ও ভাঙচুর। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে এসব অঞ্চলের প্রায় ৪০০ কারখানায় ছুটি ঘোষণা করেছে কর্তৃপক্ষ। এতে একদিকে উৎপাদন কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে, অন্যদিকে নির্ধারিত সময়ে রপ্তানি আদেশ সরবরাহ নিয়ে তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা। শিল্প মালিক ও ব্যবসায়ীদের আশঙ্কা, এ অস্থিরতা দীর্ঘায়িত হলে আন্তর্জাতিক ক্রেতারা বাংলাদেশের পরিবর্তে ভিয়েতনাম, ভারত, কম্বোডিয়া কিংবা পাকিস্তানের মতো প্রতিযোগী দেশগুলোর দিকে ঝুঁকতে পারেন। ফলে শুধু পোশাকশিল্প নয়, দেশের রপ্তানি আয়, বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ এবং সামগ্রিক অর্থনীতিও বড় ঝুঁকিতে পড়তে পারে। শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি ও অধিকার নিশ্চিত করার দাবির পাশাপাশি আন্দোলনের নামে সহিংসতা, ভাঙচুর এবং রাজনৈতিক ইন্ধনের অভিযোগ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। এমন বাস্তবতায় শ্রমিক-মালিকের স্বার্থ রক্ষা, উৎপাদন সচল রাখা এবং রপ্তানি বাজার ধরে রাখাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
শ্রমিকদের ক্ষোভের কারণ মজুরি ও চাকরির নিরাপত্তা : শ্রমিকদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে দ্রব্যমূল্য, বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ও যাতায়াত ব্যয় বাড়লেও সেই অনুপাতে মজুরি বাড়েনি। বর্তমানে পোশাকশ্রমিকদের ন্যূনতম মাসিক মজুরি ১২ হাজার ৫০০ টাকা। অথচ এই বেতনে পরিবার নিয়ে জীবনযাপন কঠিন হয়ে পড়েছে। এ কারণে ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণের দাবি জানিয়েছেন তারা। এর পাশাপাশি শ্রমিকদের চাকরির নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে।
মালিকদের উদ্বেগ, উৎপাদন ও রপ্তানি নিয়ে শঙ্কা : অন্যদিকে পোশাকশিল্প মালিকদের বক্তব্য, শ্রমিকদের জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং ন্যায্য মজুরির প্রয়োজনীয়তা তারা উপলব্ধি করেন। তবে বর্তমান বৈশি^ক অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে শিল্পটি নানা চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে। উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, জ¦ালানিসংকট, গ্যাস-বিদ্যুতের অনিশ্চয়তা, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা এবং রপ্তানি আদেশ কমে যাওয়ায় অনেক কারখানা আর্থিক চাপে রয়েছে।
বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বাবু জানিয়েছেন, শ্রমিকদের আন্দোলনের কারণে উৎপাদন কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ায় মালিকেরা উদ্বিগ্ন। পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে বাংলাদেশ শ্রম আইনের ১৩(১) ধারা অনুযায়ী কারখানা বন্ধ করে দিতে বাধ্য হতে পারেন মালিকরা। তিনি শ্রমিক সংগঠন ও ফেডারেশনগুলোকে আন্দোলন নিয়ন্ত্রণে দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখার আহ্বান জানিয়েছেন। একই সঙ্গে শ্রমিক ও মালিক- উভয় পক্ষের জন্য আইন সমানভাবে প্রয়োগের দাবি জানিয়েছেন তিনি।
অন্যদিকে বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেছেন, শ্রমিকদের জীবনযাত্রার ব্যয়ের চাপ মালিকেরাও উপলব্ধি করেন। তবে বৈশ্বিক বিষয়ও বিবেচনায় নিতে হবে। শ্রমিকের ন্যায্য পাওনা নিশ্চিত করার পাশাপাশি কারখানার সক্ষমতা ধরে রাখতে আলোচনার মাধ্যমে গ্রহণযোগ্য মজুরি কাঠামো নির্ধারণ করতে হবে।
অর্থনীতিতে বহুমুখী ঝুঁকি : বাংলাদেশের অর্থনীতির একটি প্রধান চালিকাশক্তি তৈরি পোশাকশিল্প। এ খাতে প্রায় ৪০ লাখ শ্রমিক কাজ করেন এবং দেশের মোট রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশের বেশি আসে এ খাত থেকে। ফলে শিল্পাঞ্চলের অস্থিরতা দীর্ঘায়িত হলে এর প্রভাব শুধু শ্রমিক ও মালিকের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; রপ্তানি, বৈদেশিক মুদ্রা আয়, ব্যাংকিং খাত, পরিবহন, বন্দর ও সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ও পড়বে।
রপ্তানি আদেশ অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ে পণ্য জাহাজীকরণ করতে না পারলে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। সময়মতো পণ্য সরবরাহে ব্যর্থ হলে ক্রেতারা বিকল্প উৎপাদনকারী দেশ হিসেবে ভিয়েতনাম, ভারত, কম্বোডিয়া কিংবা পাকিস্তানের দিকে ঝুঁকতে পারেন। এতে ভবিষ্যতে নতুন ক্রয়াদেশ পাওয়ার ক্ষেত্রেও প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।






