সিলেটে বেড়েছে শিক্ষার্থী আত্মহত্যা
প্রকাশিত হয়েছে : ০১ আগস্ট ২০২৬, ৩:২২:৫৬ অপরাহ্ন
পারিবারিক বোঝাপড়া বাড়ানোর তাগিদ বিশেষজ্ঞদের

মামুন পারভেজ : দেশে শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার প্রবণতা উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। জাতীয় পর্যায়ের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, অন্যান্য বিভাগের তুলনায় সিলেটে শিক্ষার্থী আত্মহত্যার হার সবচেয়ে কম হলেও এক বছরের ব্যবধানে সিলেটে আত্মহত্যার সংখ্যা বেড়েছে। মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই প্রবণতা রোধে পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সমাজকে আরও সচেতন এবং সহানুভূতিশীল হতে হবে।
আঁচল ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে মোট ৩১০ জন শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেন। ২০২৫ সালে দেশে শিক্ষার্থী আত্মহত্যার সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৪০৩ জনে। বিভাগভিত্তিক বিশ্লেষণে ২০২৩ সালে সিলেট বিভাগের ২.১ শতাংশ, ওই বছর সারা দেশে ৫১৩জন আত্মহত্যা করেন। সে হিসাবে সিলেট বিভাগে আনুমানিক ৬ থেকে ৭ জন শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছেন বলে ধারণা করা হয়। ২০২৪ সালে দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও গণমাধ্যমে খবর কম আসার কারণে সামগ্রিক আত্মহত্যার নথিভুক্ত সংখ্যা কিছুটা কমে দাঁড়ায় ৩১০ জনে। এই বছরও সিলেট বিভাগ দেশের অন্যন্য বিভাগের তুলনায় সর্বনিম্ন অবস্থানে ছিল। সিলেটে ছিল ১.৯ শতাংশ থেকে ২.১শতাংশ এর মধ্যে। সংখ্যার দিক থেকে আনুমানিক ৬ থেকে ৭ জন শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেন।
পরের বছর পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়ে ওঠে। ২০২৫ সালে দেশে শিক্ষার্থী আত্মহত্যার সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৪০৩ জনে। এর মধ্যে প্রায় ৪৭.৪ শতাংশ ছিল স্কুলপড়ুয়া শিশু। একই সময়ে সিলেট বিভাগে আত্মহত্যার হার বেড়ে প্রায় ২.৫ শতাংশে পৌঁছায়। এই হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালে সিলেটে আনুমানিক ১০ থেকে ১১ জন শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছেন।
অর্থাৎ, এক বছরের ব্যবধানে সিলেটে শিক্ষার্থী আত্মহত্যার সংখ্যা প্রায় চারটি বেড়েছে। সংখ্যাটি দেশের অন্যান্য বিভাগের তুলনায় কম হলেও বৃদ্ধির এই প্রবণতা সংশ্লিষ্টদের উদ্বিগ্ন করে তুলেছে।
এছাড়া, অনেক ঘটনা নথিভুক্তির বাইরে থেকে যাওয়ায় এ সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে বলে দাবি করেন সংশ্লিষ্টরা।
চলতি বছরের জুন মাসে নগরের সুবিদবাজার মিয়া ফাজিলচিশত এলাকা থেকে দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী মাহদি আনজুমের (১৫) ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিস। এসময় ইংরেজিতে লেখা একটি সুসাইড নোট উদ্ধার করে পুলিশ। ইংরেজিতে লেখা চিরকুটে নিজের ইচ্ছায় জীবন শেষ করার কথা উল্লেখ করে ময়নাতদন্ত বা পুলিশি তদন্ত না করার অনুরোধ করা হয়েছিল।
এদিকে, চলতি বছরের আত্মহত্যার পূর্ণাঙ্গ পরিসংখ্যান এখনও কোনো সংস্থা প্রকাশ করেনি।
মানসিক স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পরীক্ষার চাপ, পারিবারিক দ্বন্দ্ব, সম্পর্কজনিত সংকট, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নেতিবাচক প্রভাব, একাকীত্ব এবং মানসিক সমস্যাকে গুরুত্ব না দেওয়ার কারণে অনেক শিক্ষার্থী চরম সিদ্ধান্তের দিকে ঝুঁকে পড়ে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে আত্মহত্যার আগে তারা কোনো না কোনোভাবে মানসিক সংকটের ইঙ্গিত দিলেও তা পরিবার বা আশপাশের মানুষ গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করেন না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শিক্ষার্থীদের সঙ্গে নিয়মিত খোলামেলা আলোচনা, তাদের অনুভূতি মনোযোগ দিয়ে শোনা, অযৌক্তিক প্রত্যাশা ও অতিরিক্ত চাপ কমানো এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কার্যকর কাউন্সেলিং সেবা নিশ্চিত করা জরুরি। পাশাপাশি সামাজিকভাবে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে বিদ্যমান সংকোচ দূর করতে হবে, যাতে সংকটে থাকা শিক্ষার্থীরা সহজেই সহায়তা চাইতে পারে।
সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, আত্মহত্যা প্রতিরোধ কেবল একটি স্বাস্থ্যগত বিষয় নয়; এটি পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সমাজ এবং রাষ্ট্রের সম্মিলিত দায়িত্ব। সময়মতো মানসিক সহায়তা ও পারিবারিক বোঝাপড়া বাড়ানো গেলে অনেক মূল্যবান প্রাণ রক্ষা করা সম্ভব।
সামাজিক ও স্বেচ্ছেসেবী সংগঠন আঁচল ফাউন্ডেশনের সভাপতি তানসেন রোজ দৈনিক জালালাবাদকে বলেন, ‘ আত্মহত্যা প্রতিরোধে জনসচেতনতা বাড়ানোর জন্য সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে বিভিন্ন কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা যেতে পারে। মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সাধারণ মানুষের মাঝে যে ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে তার দূর করার লক্ষ্যে দেশব্যাপী ক্যাম্পেইন করা প্রয়োজন।’
তিনি আরও বলেন, ‘আত্মহত্যার লক্ষণ সম্পর্কে দেশের সকল শিক্ষার্থীদেরকে ধারণা দেয়া যেতে পারে। সন্তানের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে বাবা মায়েদের আরো বেশি সতর্ক থাকা প্রয়োজন। শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীদের মাঝে মেলবন্ধন তৈরির লক্ষ্যে শিক্ষকদেরকে মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক প্রশিক্ষণের আওতায় আনা দরকার। সর্বোপরি, শিক্ষার্থীদের উপর সমাজের প্রত্যাশার পারদ কমানো, সামজিক তুলনা না করা, হেয় প্রতিপন্ন না করার মাধ্যমে আত্মহত্যার হার কমিয়ে আনা যেতে পারে।’
মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. গোপী কান্ত রায়ের মতে, আত্মহত্যা প্রতিরোধে পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সমাজকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
তিনি দৈনিক জালালাবাদকে বলেন, ‘১৩ থেকে ১৯ বছর বয়সী কিশোর-কিশোরীদের সঙ্গে বাবা-মায়ের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলা জরুরি। তাদের কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা, অনুভূতিকে গুরুত্ব দেওয়া এবং কোনো সমস্যা বা ব্যর্থতার জন্য অপমান বা অতিরিক্ত চাপ না দিয়ে মানসিকভাবে পাশে থাকতে হবে। সন্তান যেন যেকোনো সংকটের কথা নির্ভয়ে পরিবারের সঙ্গে ভাগ করে নিতে পারে, সেই পরিবেশ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, ‘উচ্চশিক্ষার পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে ভবিষ্যৎ, ক্যারিয়ার ও চাকরি নিয়ে অনিশ্চয়তা থেকে সৃষ্ট মানসিক চাপ কমাতে নিয়মিত কাউন্সেলিং, ক্যারিয়ার গাইডেন্স এবং মানসিক স্বাস্থ্যসেবা সহজলভ্য করা উচিত। একই সঙ্গে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কাউন্সেলর নিয়োগ, শিক্ষকদের মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং ঝুঁকিপূর্ণ শিক্ষার্থীদের দ্রুত শনাক্ত করে প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে।’
ডা. গোপীকান্ত রায় আরও বলেন, ‘আত্মহত্যাকে ঘিরে সামাজিক কুসংস্কার ও নীরবতার সংস্কৃতি ভাঙতে হবে। মানসিক সংকটে থাকা ব্যক্তিকে দোষারোপ না করে সহমর্মিতা দেখানো এবং প্রয়োজন হলে দ্রুত মনোরোগ বিশেষজ্ঞ বা মনোবিজ্ঞানীর পরামর্শ নেওয়াই হতে পারে একটি জীবন রক্ষার সবচেয়ে কার্যকর পদক্ষেপ।’






