রায়নগরে ট্রিপল মার্ডার : রহস্য উদঘাটনের দাবী পুলিশের, আটক ১
প্রকাশিত হয়েছে : ১৩ আগস্ট ২০২৬, ১২:০৯:৪১ অপরাহ্ন
*স্বামী-স্ত্রী ও গৃহকর্মীকে গলাকেটে হত্যা*
*নেপথ্যে গৃহকর্মীর প্রেম নাকি অন্যকিছু*

স্টাফ রিপোর্টার : সিলেট নগরীর রায়নগর মিতালী আবাসিক এলাকায় নৃশংস ট্রিপল মার্ডারের ঘটনা ঘটেছে। বুধবার সকাল সাড়ে ৯টার দিকে নিজের বাসা থেকে ব্যবসায়ী আব্দুস সাত্তার, তার স্ত্রী ও গৃহকর্মীর লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। রায়নগরে নৃশংস হত্যাকান্ডে নগরজুড়ে বিরাজ করছে আতংক। হত্যাকান্ডের রহস্য উদঘাটন ও ঘাতককে গ্রেফতার করেছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
এদিকে নৃশংস হত্যার ঘটনায় চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে। পুলিশের দাবি, গৃহকর্মী তাহমিনার সঙ্গে প্রেমের সম্পর্কের সূত্র ধরে ওই বাসায় প্রবেশ করেন বাবুল মিয়া (৪০)। পরে তাহমিনাকে হত্যার পর তাকে চিনে ফেলায় গৃহকর্ত্রী সুরাইয়া বেগম এবং তার স্বামী এম এ সাত্তারকেও হত্যা করেন তিনি।
বুধবার সকালে মিতালী ১১১ নম্বর বাসা থেকে তিনজনের মরদেহ উদ্ধারের পর থেকেই রায়নগর এলাকাসহ পুরো নগরজুড়ে আতঙ্ক ও চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। দিনভর দফায় দফায় ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, সিটি প্রশাসক এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ। বুধবার সন্ধ্যার দিকে পুলিশ আটক ব্যক্তিকে নিয়ে অভিযান চালিয়ে অস্ত্র উদ্ধারের কথা জানায়।
নিহত তিনজনের পরিচয় :
নিহতরা হলেন-মিতালী ১১১ নম্বর বাসার বাসিন্দা এম এ সাত্তার (৮২), তার স্ত্রী সুরাইয়া বেগম (৭২) এবং তাদের গৃহকর্মী তাহমিনা (২৫)। তবে তাহমিনার বয়স নিয়ে প্রাথমিক তথ্যে ভিন্নতা রয়েছে; তদন্তে তার সঠিক বয়স নিশ্চিত করা হবে।
তাহমিনা সুনামগঞ্জের দোয়ারাবাজার এলাকার দিনমজুর আপ্তাব মিয়ার মেয়ে। গত কোরবানির ঈদের পর তিনি ওই বাসায় কাজে যোগ দেন। অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি পরিবারের দৈনন্দিন কাজের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েছিলেন।
অন্যদিকে আটক বাবুল মিয়া (৪০) নগরীর রায়নগর রাজবাড়ী এলাকার আক্তার মিয়ার কলোনির বাসিন্দা। তিনি মৃত নুর কবিরাজের ছেলে। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, পেশায় রংমিস্ত্রি হলেও মাঝে মাঝে কসাইয়ের কাজ করতেন।
যেভাবে প্রকাশ্যে আসে তিন খুন :
বুধবার সকালে মিতালী ১১১ নম্বর বাসার দরজা বন্ধ দেখতে পান স্থানীয় এক ব্যক্তি। বাসার ভেতর থেকে কোনো সাড়া না পেয়ে সন্দেহ হলে তিনি দরজার নিচ দিয়ে রক্ত বের হতে দেখতে পান। সঙ্গে সঙ্গে পুলিশকে খবর দেওয়া হয়।
খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে দরজা খুলে বাসার ভেতর থেকে তিনজনের মরদেহ উদ্ধার করে। নিহতদের গলায় ধারালো অস্ত্রের আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায় বলে জানিয়েছে পুলিশ।
সিলেট মহানগর পুলিশের (এসএমপি) মিডিয়া অফিসার ও অতিরিক্ত উপকমিশনার মো. মনজুরুল আলম তিনজনের মরদেহ উদ্ধারের বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
পুলিশের দাবি- প্রথমে তাহমিনা, পরে স্বামী-স্ত্রী :
সন্ধ্যায় ঘটনাস্থলে প্রেস ব্রিফিংয়ে এসএমপি কমিশনার সারোয়ার মুর্শেদ শামীম হত্যাকাণ্ডের প্রাথমিক তদন্তের বর্ণনা দেন।
পুলিশ কমিশনারের ভাষ্য অনুযায়ী, বাবুলের সঙ্গে গৃহকর্মী তাহমিনার প্রেমের সম্পর্ক ছিল। বুধবার সকাল ৯টার দিকে বাবুল ওই বাসায় তাহমিনার সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক করতে আসেন। এসময় তাহমিনা দরজা খুলে দিয়ে তাকে নিয়ে একটি রুমে যান। তখন দুইজনের মধ্যে কথা কাটাকাটির এক পর্যায়ে বাবুল ক্ষিপ্ত হয়ে তার সাথে থাকা ছুরি দিয়ে তাহমিনাকে উপর্যুপরি আঘাত করেন। তাহমিনার চিৎকার শুনে গৃহকর্ত্রী সুরাইয়া বেগম এগিয়ে এলে তিনি বাবুলকে চিনে ফেলেন বলে পুলিশের দাবি। একারণে তাকেও ছুরিকাঘাত করে হত্যা করা হয়।
এরপর সুরাইয়ার আর্তচিৎকার শুনে পাশের কক্ষ থেকে স্বামী এম এ সাত্তার এগিয়ে এলে তাকেও কুপিয়ে হত্যা করা হয় বলে জানিয়েছে পুলিশ।
পুলিশের দাবি, তিনজনকে হত্যার পর বাবুল বাসার সামনের দরজা ভেতর থেকে বন্ধ করে বারান্দা দিয়ে পালিয়ে যায়। তবে পুলিশের এই বক্তব্য তদন্তের প্রাথমিক পর্যায়ের তথ্য। ঘটনার প্রকৃত কারণ ও পুরো ঘটনাপ্রবাহ তদন্ত শেষে নিশ্চিত হবে।
লোডশেডিং যেন তদন্তে বড় বাধা:
এদিকে নৃশংস হত্যাকাণ্ডের অন্যতম রহস্য হয়ে দাঁড়িয়েছে সিসি ক্যামেরার ফুটেজ। বাসায় সিসি ক্যামেরা থাকলেও হত্যাকাণ্ডের সময় এলাকায় লোডশেডিং ছিল বলে জানিয়েছে পুলিশ। ফলে ওই সময় ক্যামেরায় হত্যাকাণ্ডের দৃশ্য কিংবা বাবুলের বাসায় প্রবেশের কোনো ফুটেজ রেকর্ড হয়নি। এতে তদন্তকারীদের জন্য ঘটনাপ্রবাহ পুনর্গঠন আরও কঠিন হয়ে পড়েছে। এখন পুলিশের ভরসা ঘটনাস্থলের আলামত, উদ্ধার করা অস্ত্র, আটক ব্যক্তির বক্তব্য এবং অন্যান্য পারিপার্শ্বিক তথ্য।
আলমারি-ওয়ারড্রোব খোলা, ছিল দলিলও :
তিনজনের মরদেহ উদ্ধারের পর ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন এসএমপি কমিশনার সারোয়ার মুর্শেদ শামীম। তিনি জানান, বাসার পরিবারের সদস্যদের ব্যবহৃত আলমারি ও ওয়ারড্রোব খোলা অবস্থায় পাওয়া গেছে। এসব জায়গা থেকে স্বর্ণালংকার বা অন্য কোনো মূল্যবান জিনিস সরানো হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে জানান তিনি।
পুলিশ কমিশনার বলেন, ঘটনাটি ডাকাতি, নাকি এর পেছনে পারিবারিক শত্রুতা বা পূর্ববিরোধ রয়েছে-সব দিক সামনে রেখে তদন্ত করা হচ্ছে। বাসার ভেতর একটি দলিলও পাওয়া গেছে এবং সেটিকেও গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে।
অর্থাৎ, বাবুলকে আটকের পর প্রেমের সম্পর্কের বিষয়টি সামনে এলেও তদন্তকারীরা অন্য কোনো সম্ভাবনা এখনই বাদ দিচ্ছেন না।
চুলায় রান্না করা মাংস, থমকে গেল স্বাভাবিক সকাল :
হত্যাকাণ্ডের পর বাসার ভেতরের একটি দৃশ্যও নজর কেড়েছে তদন্তকারীদের। প্রতিদিনের মতো বুধবার সকালেও বাসায় রান্না করা হয়েছিল। পুলিশ বাসায় ঢুকে দেখতে পায়, চুলার ওপর নতুন রান্না করা গরুর মাংসের পাত্র রাখা রয়েছে। অর্থাৎ, হত্যাকাণ্ডের কিছুক্ষণ আগেও বাসায় চলছিল স্বাভাবিক দিনের মতো রান্নাবান্না।
এরপরই ঘটে যায় তিনটি হত্যাকাণ্ড। ফলে বাসার স্বাভাবিক সকাল থেকে নৃশংস হত্যাকাণ্ড পর্যন্ত সময়ের ঘটনাপ্রবাহও তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।
ঘটনাস্থলে পুলিশ কমিশনার থেকে সিটি প্রশাসক:
খবর পাওয়ার পরপরই ঘটনাস্থলে ছুটে যান পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। এসএমপি কমিশনার সারোয়ার মুর্শেদ শামীম নিজে দফায় দফায় ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন।
পরে সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরীও ঘটনাস্থলে যান। তিনি পুলিশের কমিশনার, অতিরিক্ত কমিশনার ও উপকমিশনারসহ কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলেন।
তিনি সাংবাদিকদের বলেন, এটি একটি ক্রাইম সিন। তাই তদন্তের স্বার্থে গণমাধ্যমকর্মী কিংবা সাধারণ মানুষের অবাধ চলাচল ঠিক হবে না। তদন্ত শেষ হওয়ার আগে ঘটনার কারণ কিংবা বাসার ভেতরের পরিস্থিতি নিয়ে মন্তব্য না করে বিষয়টি পুলিশ তদন্ত করে জানাবে বলে জানান তিনি।
বিএনপি-জামায়াত নেতাদের ঘটনাস্থল পরিদর্শন :
নৃশংস হত্যাকাণ্ডের খবর ছড়িয়ে পড়লে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারাও ঘটনাস্থলে যান। বিএনপি ও জামায়াতের নেতৃবৃন্দ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের দ্রুত গ্রেফতার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান। এসময় উপস্থিত ছিলেন সিলেট মহানগর বিএনপির সিনিয়র সহ-সভাপতি ও সিউক চেয়ারম্যান রেজাউল হাসান কয়েস লোদী, মহানগর জামায়াতের আমীর মুহাম্মদ ফখরুল ইসলাম, জেলা আমীর মাওলানা হাবিবুর রহমান, মহানগর বিএনপি সেক্রেটারী এমদাদ হোসেন চৌধুরী প্রমূখ।
তারা বলেন, একটি আবাসিক এলাকায় একই পরিবারের তিনজনকে এভাবে হত্যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের পাশাপাশি নগরীর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন।
এখনো যেসব প্রশ্নের উত্তর মেলেনি :
বাবুলকে আটকের পর হত্যাকাণ্ডের একটি সম্ভাব্য কারণের কথা জানিয়েছে পুলিশ। তার দেওয়া তথ্যে অস্ত্র উদ্ধারের অভিযান চলছে। তবে পুরো ঘটনার নেপথ্যে আরও কোনো বিষয় আছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
তাহমিনার সঙ্গে বাবুলের সম্পর্কের প্রকৃতি কী ছিল, তিনি কীভাবে বাসায় প্রবেশ করেছিলেন, হত্যাকাণ্ডের সুনির্দিষ্ট সময় কতটা, লোডশেডিং ঠিক কখন শুরু হয়েছিল, বাসা থেকে কোনো মূল্যবান জিনিস খোয়া গেছে কি না, পাওয়া দলিলের সঙ্গে হত্যাকাণ্ডের কোনো যোগসূত্র আছে কি না এবং ঘটনায় বাবুল একাই জড়িত ছিলেন কি না-এসব প্রশ্নের উত্তর এখন তদন্তের ওপর নির্ভর করছে।






