কলিং ভিসার নামে ফের শুরু ‘মানুষের বেচাকেনা’ : ‘শূন্য অভিবাসন ব্যয়’ উদ্যোগ কতটা বাস্তবায়ন হবে?
প্রকাশিত হয়েছে : ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৭:০৪:৫৬ অপরাহ্ন
আহমাদুল কবির, মালয়েশিয়া: বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকের পর নতুন করে খুলেছে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারের সম্ভাবনার দুয়ার। দুই দেশের সরকারের উদ্যোগে বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য নতুন করে নিয়োগপ্রক্রিয়া শুরুর উদ্যোগ নেওয়া হলেও এরই মধ্যে সক্রিয় হয়ে উঠেছে একটি চক্র। ‘কলিং ভিসা’, ‘কোটা’, ‘ভিসা রেডি’, ‘ডিমান্ড লেটার’ কিংবা ‘মালয়েশিয়ার কোম্পানির কাজ’-এমন নানা আকর্ষণীয় শব্দ ব্যবহার করে চলছে প্রচার। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ব্যক্তিগত নেটওয়ার্কে চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে সম্ভাব্য কর্মীদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা চাওয়ার অভিযোগও উঠছে।
দুই দেশের যৌথ ঘোষণায় নতুন কর্মী নিয়োগে কোনো মধ্যস্বত্বভোগীর সুযোগ না রাখার কথা স্পষ্ট করা হয়েছে। তবে মাঠের বাস্তবতা নিয়ে ইতোমধ্যে প্রশ্ন উঠেছে। আগের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়ার কথা বলা হলেও দালাল ও মধ্যস্বত্বভোগীদের তৎপরতা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।
মালয়েশিয়ার নির্ধারিত পদ্ধতি অনুযায়ী, দেশটির নিয়োগকর্তাকে বাংলাদেশে অনুমোদিত ২৬টি রিক্রুটিং এজেন্সির মধ্য থেকে একটি এজেন্সি নির্বাচন করতে হবে। নিয়োগকর্তা এসব এজেন্সির মাধ্যমে সরাসরি কর্মী বাছাই করবেন। ফলে একজন সম্ভাব্য কর্মীর জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হওয়া উচিতÑপ্রকৃত নিয়োগকর্তা কে, চাকরিটি কোন খাতে, বেতন কত, অনুমোদিত কোটা আছে কি না এবং বাংলাদেশে কোন বৈধ রিক্রুটিং এজেন্সি তাকে নিয়োগ দিচ্ছে? কিন্তু বাস্তবে এসব মৌলিক তথ্যের পরিবর্তে সম্ভাব্য কর্মীদের কাছে ঘুরছে ‘ভিসা’, ‘কোটা’ ও ‘ডিমান্ড’ কেনাবেচার খবর। ফলে নির্বাচিত না হয়েও আগাম টাকা দিয়ে বসে থাকা কর্মীরা শেষ পর্যন্ত কী অবস্থায় পড়বেন, তা নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, মালয়েশিয়ায় কর্মী নিয়োগের ভিসাকে বাংলাদেশি মধ্যস্বত্বভোগীরা দীর্ঘদিন ধরে ‘কলিং ভিসা’ নামে পরিচিত করে তুলেছেন। এর সঙ্গে তৈরি হয়েছে আরও কিছু অমানবিক শব্দের প্রচলন-‘কয়টা মাথা’, ‘কয়টা বডি’, ‘কয়টা যাত্রী’ কিংবা ‘কয়টা পাসপোর্ট’।
শ্রম অভিবাসন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, একজন কর্মী কোনো পণ্য নন যে তাকে ‘বডি’ বা ‘পাসপোর্ট’ হিসেবে গণনা করা হবে। কিন্তু বাস্তবে কর্মী নিয়োগের পুরো প্রক্রিয়ায় মানুষের পরিবর্তে সংখ্যা, পাসপোর্ট ও টাকার হিসাবই যেন বড় হয়ে উঠেছে। এতে শুধু কর্মীর অধিকার ক্ষুণ্ন হচ্ছে না, আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে বাংলাদেশের ভাবমূর্তিও প্রশ্নের মুখে পড়ছে।
বিদেশে কর্মসংস্থানে প্রতারণা ও অতিরিক্ত অর্থ আদায় ঠেকাতে বর্তমান সরকার যে ২০টি লক্ষ্য সামনে রেখেছে, তার অন্যতম হলো বিনা মূল্যে বা স্বল্প ব্যয়ে কর্মী পাঠানো। মালয়েশিয়ার ক্ষেত্রেও ‘শূন্য অভিবাসন ব্যয়’ নীতির সঙ্গে বাংলাদেশের এ উদ্যোগের মিল রয়েছে। ইতোমধ্যে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সরকারি রিক্রুটিং এজেন্সি বোয়েসেলের মাধ্যমে ১০ হাজার কর্মীকে কোনো ধরনের অর্থ ব্যয় ছাড়াই মালয়েশিয়ায় পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। তবে প্রশ্ন উঠেছে-সরকারি ব্যবস্থায় ১০ হাজার কর্মী বিনা খরচে গেলেও বেসরকারি রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে যাওয়া কর্মীদের ক্ষেত্রেও কি একই নীতি কার্যকর হবে?
এটাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ অতীতে বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগকে কেন্দ্র করে অতিরিক্ত অর্থ আদায়, অনিয়ম ও মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্যের অভিযোগে মালয়েশিয়াকে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছে।
বিগত নিয়োগপ্রক্রিয়া পর্যালোচনায় দেখা যায়, মালয়েশিয়া থেকে চাহিদাপত্র ও ভিসা সংগ্রহের পর বাংলাদেশে কর্মী প্রক্রিয়াকরণে সীমিতসংখ্যক রিক্রুটিং এজেন্সির ভূমিকা নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। আন্দোলন, মামলা এবং দুই দেশের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অভিযোগের পর ‘সিন্ডিকেট’ শব্দটি শ্রমবাজারের সঙ্গে নেতিবাচকভাবে জড়িয়ে যায়। এরপর বাংলাদেশ সরকার ৪৯টি রিক্রুটিং এজেন্সির লাইসেন্স বাতিল করে। নিম্ন ও উচ্চ আদালতে একাধিক মামলাও চলমান রয়েছে। তবে অভিযোগ রয়েছে, ভিসা ও পাসপোর্ট কেনাবেচার পুরোনো প্রবণতা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। বাংলাদেশি রিক্রুটিং এজেন্সিগুলো বৈধভাবে কর্মী নিয়োগের চাহিদাপত্র ও ক্ষমতা পেলেও উপযুক্ত কর্মী সংগ্রহের ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে মধ্যস্বত্বভোগীরা।
বিএমইটির সূত্র অনুযায়ী, লাইসেন্সধারী রিক্রুটিং এজেন্সির হয়ে অনেক ক্ষেত্রে দালালরাই কর্মী সংগ্রহ থেকে শুরু করে বিমানবন্দরে তুলে দেওয়া পর্যন্ত কাজ করে। ফলে বিদেশে থাকা কর্মীদের রিক্রুটিং এজেন্সির নাম জানতে চাইলে তারা অনেক সময় এজেন্সির বদলে দালালের নাম বলেন।
অভিযোগ তদন্ত করতে গিয়ে এমন ঘটনাও পাওয়া গেছে, যেখানে অভিযোগকারী কর্মী সংশ্লিষ্ট রিক্রুটিং এজেন্সির নাম বলতে পারেননি; তিনি শুধু যে দালালের মাধ্যমে বিদেশে গেছেন, তার নাম বলতে পেরেছেন।
বিদেশে নিরাপদ কর্মসংস্থান শেষ পর্যন্ত নির্ভর করে প্রকৃত নিয়োগকর্তা ও বৈধ নিয়োগপ্রক্রিয়ার ওপর। এ বিষয়ে তথ্য যাচাই করতে নিকটস্থ ডেমো অফিস বা টেকনিক্যাল ট্রেনিং সেন্টারের (টিটিসি) সঙ্গে যোগাযোগ করার পরামর্শও দিয়েছে মন্ত্রণালয়।
এখন দেখার বিষয়, সরকারের ঘোষণা অনুযায়ী মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর নতুন অধ্যায় সত্যিই কি হবে মধ্যস্বত্বভোগীমুক্ত, স্বচ্ছ ও স্বল্প ব্যয়েরÑনাকি পুরোনো কায়দায় আবারও শুরু হবে ‘কলিং ভিসা’ নামের আড়ালে মানুষের স্বপ্নের বেচাকেনা।





