বাজার সিন্ডিকেট ও চামড়া খাতের সংকট, ১০ বছরের হিসাব চায় সংসদীয় কমিটি
প্রকাশিত হয়েছে : ২৬ অক্টোবর ২০২৬, ৮:১১:০৪ অপরাহ্ন

জালালাবাদ রিপোর্ট: নিত্যপণ্যের বাজারে সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা, প্রতিযোগিতা কমিশনের ১০ বছরের কার্যক্রম, ২৩টি বাণিজ্য মিশনের ব্যয় ও সাফল্য এবং চামড়া শিল্পের সংকট নিরসনে বিস্তারিত হিসাব চেয়েছে জাতীয় সংসদের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি। একই সঙ্গে টিসিবির ডিলার নিয়োগে রাজনৈতিক প্রভাব ও অনিয়ম বন্ধ করে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার তাগিদ দিয়েছে কমিটি।
সম্প্রতি কমিটির সভাপতি মো. খালেদ হোসেন মাহবুবের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে এসব নির্দেশনা দেওয়া হয়। বৈঠকে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির, কমিটির সদস্য এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
বৈঠকে বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশনের ২০১৬ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত কার্যক্রম, বড় প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে নেওয়া ব্যবস্থা, আদায় করা জরিমানা এবং উচ্চ আদালতে বিচারাধীন ২৪টি মামলার বিস্তারিত তথ্য পরবর্তী সভায় উপস্থাপনের নির্দেশ দেওয়া হয়।
কমিটির সদস্যরা বলেন, বাজারে কয়েকটি বড় ব্যবসায়ী গ্রুপের আধিপত্য ও সিন্ডিকেটের কারণে সাধারণ মানুষকে বাড়তি দামে পণ্য কিনতে হচ্ছে। প্রতিযোগিতা কমিশন দীর্ঘ তদন্তের পর ব্যবস্থা নিলেও মামলা ও রিটের কারণে জরিমানা আদায় আটকে থাকছে। এ পরিস্থিতিতে কমিশনের কার্যকারিতা ও বাস্তব অর্জন পর্যালোচনার ওপর গুরুত্ব দেন তারা।
কমিশনের চেয়ারম্যান এ এইচ এম আহসান জানান, ভোজ্যতেলের বাজারে প্রতিযোগিতা-বিরোধী কর্মকাণ্ডের অভিযোগে এস আলম ভেজিটেবল অয়েলকে ৪৪ কোটি টাকা এবং সিটি গ্রুপকে প্রায় ৩২ কোটি টাকা জরিমানা করা হয়েছে। ডিমের বাজারে প্যারাগন পোল্ট্রি, সিপি ও কাজী ফার্মসের বিরুদ্ধেও জরিমানার ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তবে উচ্চ আদালতে মামলা চলমান থাকায় জরিমানা আদায়ে জটিলতা তৈরি হচ্ছে।
কমিটির সদস্য মো. বরকত উল্লাহ বুলু চাল, ডাল, আটা ও ভোজ্যতেলের গত তিন বছরের আমদানি মূল্য, ডলারের বিনিময় হার এবং স্থানীয় বাজারে বিক্রয়মূল্যের ব্যবধান নিরূপণের প্রস্তাব দেন। এ জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে প্রতিবেদন তৈরির তাগিদ দেওয়া হয়।
২৩ বাণিজ্য মিশনের ব্যয়-সাফল্যের হিসাব তলব:
বিদেশে বাংলাদেশের ২৩টি বাণিজ্য মিশনে কর্মকর্তা নিয়োগ, সরকারের ব্যয় এবং রপ্তানি ও বিনিয়োগ বৃদ্ধিতে তাদের অবদানের বিস্তারিত হিসাব চেয়েছে কমিটি। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আতাউর রহমান খান জানান, ২০টি দেশে অবস্থিত এসব মিশনের কার্যক্রম মূল্যায়নের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। চলতি বছরে ৬৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের রপ্তানি লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে তাদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।
বাণিজ্যমন্ত্রী জানান, বাণিজ্য মিশনগুলো সরাসরি ব্যবসা করে না; বরং বেসরকারি খাতকে রপ্তানি ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণে সহায়তা করে। সাম্প্রতিক সময়ে কয়েকটি স্টেশনে কর্মকর্তা নিয়োগে উচ্চপর্যায়ের কমিটির মাধ্যমে স্বচ্ছ প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছে। আগের নিয়োগের তালিকাও সংসদীয় কমিটিতে উপস্থাপন করা হবে।
সিইটিপি সংস্কার ও চামড়া খাতের রোডম্যাপ:
চামড়া শিল্পের সংকট নিরসনে সুনির্দিষ্ট সময়সীমাসহ রোডম্যাপ তৈরির নির্দেশ দিয়েছে কমিটি। সাভারের ট্যানারি শিল্পনগরীর কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার (সিইটিপি) কার্যকর করা, কাঁচা চামড়ার ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা এবং রপ্তানি বাড়ানোর বিষয়েও আলোচনা হয়।
বাণিজ্যমন্ত্রী জানান, সিইটিপির দৈনিক প্রক্রিয়াকরণ সক্ষমতা ২৫ হাজার ঘনমিটার হলেও বর্তমানে তা কমে ১৪ থেকে ১৫ হাজার ঘনমিটারে নেমেছে। ক্রোমিয়াম পুনরুদ্ধার ব্যবস্থার ঘাটতি এর অন্যতম সমস্যা। সিইটিপি সংস্কার বা পুনর্নির্মাণে ইতালির একটি প্রতিষ্ঠানের সম্ভাব্যতা সমীক্ষার প্রতিবেদন পর্যালোচনা করা হচ্ছে।
তিনি আরও জানান, চামড়া শিল্পের উন্নয়নে শিল্পমন্ত্রী, পরিবেশমন্ত্রী, বাণিজ্য সচিবসহ সংশ্লিষ্টদের নিয়ে উচ্চপর্যায়ের টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছে। সক্ষম উদ্যোক্তাদের আর্থিক ও কারিগরি সহায়তা দিয়ে আন্তর্জাতিক মানের সনদ অর্জনে সহযোগিতা করা হবে। যারা ব্যবসা চালিয়ে যেতে পারবেন না, তাদের জন্য সম্মানজনকভাবে ব্যবসা থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সুযোগ তৈরির বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে।
টিসিবির ডিলার নিয়োগে স্বচ্ছতার নির্দেশ:
টিসিবির ডিলার নিয়োগে সংসদ সদস্যদের ডিও লেটারের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন কমিটির সদস্যরা। তারা বলেন, ডিলার নিয়োগে রাজনৈতিক সুপারিশের পরিবর্তে নির্ধারিত সরকারি পদ্ধতি অনুসরণ করতে হবে। রাজনৈতিক প্রভাব ও অনিয়ম বন্ধে কার্যকর নজরদারি জোরদারের সুপারিশ করা হয়।
বৈঠকে মন্ত্রণালয়ের জবাবদিহিতা বাড়ানো এবং তৃণমূল পর্যায়ে সেবা পৌঁছে দেওয়ার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়। বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, স্থায়ী কমিটির প্রশ্ন, পর্যবেক্ষণ ও সুপারিশ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে।
কমিটির সভাপতি জানান, পরবর্তী সভায় সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোর কার্যক্রম নিয়ে পৃথকভাবে আলোচনা হবে। আলোচ্যসূচি অন্তত ১০ দিন আগে সদস্যদের জানানো হবে, যাতে প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্তসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত থাকতে পারেন।





