সিলেটে ফল বিপর্যয়, অর্ধেকই ফেল
প্রকাশিত হয়েছে : ৩১ অক্টোবর ২০২৬, ৬:৪৪:৪০ অপরাহ্ন

স্টাফ রিপোর্টার : সিলেট শিক্ষা বোর্ডের ২০২৬ সালের উচ্চমাধ্যমিক সার্টিফিকেট (এইচএসসি) পরীক্ষার ফলাফলে ধস নেমেছে। চলতি বছর ফল বিপর্যয়ের নেপথ্যে রয়েছে মানবিক বিভাগের শিক্ষার্থী ও অনিয়মিত শিক্ষার্থীরা। মূলত মানবিক বিভাগের শিক্ষার্থীদের ইংরেজি, গণিত ও আইসিটি ভীতির কারণে ফলাফল বিপর্যয় হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
বোর্ডের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, কোন কোন বিষয়ে শিক্ষার্থীরা বেশি খারাপ করেছেন এবং কোন অঞ্চলের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর ফল তুলনামূলক খারাপ হয়েছে, তা বিশ্লেষণ করা হবে। ফলাফলের এই অবনতির কারণ চিহ্নিত করে সংশোধনমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগও নেওয়া হবে।
প্রকাশিত ফলাফল অনুযায়ী, এ বছর পরীক্ষায় পাসের হার ৫০ দশমিক ৯০ শতাংশ। এবার প্রায় অর্ধেক ৩৫ হাজার ২৯৬ জন শিক্ষার্থীই পাস করতে পারেনি। চলতি বছর জিপিএ-৫ পেয়েছে ১ হাজার ২০৪ জন শিক্ষার্থী। গত বছর, অর্থাৎ ২০২৫ সালে সিলেট বোর্ডে এইচএসসিতে পাসের হার ছিল ৫১ দশমিক ৮৬ শতাংশ এবং জিপিএ-৫ পান ১ হাজার ৬০২ জন শিক্ষার্থী। সে হিসেবে এবার জিপিএ-৫ এর সংখ্যাও ৩৯৮টি কমেছে। পাসের হারে দিক থেকে এ বছরের ফল গত ২১ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। শনিবার (৩১ অক্টোবর) সকাল ১১টায় প্রকাশিত ফলাফলে এ তথ্য উঠে এসেছে।
বোর্ডের ফলাফল পরিসংখ্যান অনুযায়ী জানা যায়, এ বছর মোট পরীক্ষার্থী ছিলেন ৭২ হাজার ৯৫৫ জন। এর মধ্যে ২৯ হাজার ৩১৯ জন ছাত্র এবং ৪৩ হাজার ৬৩৬ জন ছাত্রী। পরীক্ষায় অংশ নেন ৭১ হাজার ৮৯৩ জন। এর মধ্যে ২৮ হাজার ৯৩৫ জন ছাত্র এবং ৪২ হাজার ৯৫৮ জন ছাত্রী।
ফলাফলে দেখা যায়, পরীক্ষায় অংশ নেওয়া ২৮ হাজার ৯৩৫ জন ছাত্রের মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছেন ১৪ হাজার ৯৬ জন। ছাত্রদের পাসের হার ৪৮ দশমিক ৭২ শতাংশ। অন্যদিকে, ৪২ হাজার ৯৫৮ জন ছাত্রীর মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছেন ২২ হাজার ৫০১ জন। ছাত্রীদের পাসের হার ৫২ দশমিক ৩৮ শতাংশ। উত্তীর্ণের সংখ্যা ও পাসের হার দুই ক্ষেত্রেই ছাত্রদের চেয়ে ছাত্রীরা এগিয়ে রয়েছেন।
বিভাগভিত্তিক ফলাফলে সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছে বিজ্ঞান বিভাগ। এ বিভাগে ১৪ হাজার ৩৫৩ জন পরীক্ষায় অংশ নিয়ে উত্তীর্ণ হয়েছেন ৯ হাজার ৮৩৮ জন। পাসের হার ৬৮ দশমিক ৫৪ শতাংশ। মানবিক বিভাগে ৪৯ হাজার ৩৫৯ জন পরীক্ষায় অংশ নিয়ে উত্তীর্ণ হয়েছেন ২২ হাজার ৮৪৮ জন। এ বিভাগে পাসের হার ৪৬ দশমিক ২৯ শতাংশ। ২৬ হাজার ৫১১ জন শিক্ষার্থী পাস করতে পারেনি। মানবিকের বিশাল সংখ্যক শিক্ষার্থী ফেল করায় ফলাফল বিপর্যয়ে ভূমিকা রেখেছে।
অন্যদিকে, ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগে ৮ হাজার ১৮১ জন পরীক্ষায় অংশ নিয়ে উত্তীর্ণ হয়েছেন ৩ হাজার ৯১১ জন। এ বিভাগে পাসের হার ৪৭ দশমিক ৮১ শতাংশ। বিভাগভিত্তিক ফলাফলে বিজ্ঞান বিভাগে পাসের হার সর্বোচ্চ এবং মানবিক বিভাগে সর্বনিম্ন। সামগ্রিক ফলাফলে ছেলেদের তুলনায় মেয়েদের এগিয়ে থাকার পাশাপাশি বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থীরা পাসের হারে অন্য দুই বিভাগের চেয়ে এগিয়ে রয়েছেন।
তথ্য মতে, এর আগে ২০০৫ সালে সিলেট বোর্ডে পাসের হার ছিল ৪৪ দশমিক ৪০ শতাংশ। এরপর ২০০৬ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে পাসের হার ওঠানামা করলেও এবার তা এখন ৫০ শতাংশের ঘরে নেমে এসেছে। গত বছর ২০২৫ সালে পাসের হার ছিল ৫১ দশমিক ৮৬ শতাংশ। এক বছরের ব্যবধানে পাসের হার আরও কমেছে।
সিলেট শিক্ষা বোর্ডের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০০৬ সালে পাসের হার ছিল ৬৫ দশমিক ৪৫ শতাংশ। পরবর্তী বছরগুলোতে তা বেড়ে ২০১০ সালে ৭৬ দশমিক ১২ শতাংশে পৌঁছায়। ২০১২ সালে পাসের হার ছিল ৮৫ দশমিক ৩৭ শতাংশ, যা করোনা মহামারির আগের সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ। এরপর ২০১৩ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত পাসের হার কমতে থাকে। ২০১৩ সালে ৭৪ দশমিক ৩০ শতাংশ থেকে নেমে ২০১৯ সালে দাঁড়ায় ৬৭ দশমিক ০৫ শতাংশে।
বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে পাসের হার ছিল ৮৫ দশমিক ৩৯ ভাগ, ২০২৩ সালে ৭১ দশমিক ৬২ ভাগ, ২০২২ সালে ৮১ দশমিক ৪০ ভাগ, ২০২১ সালে ৯৪ দশমিক ৮০ ভাগ, আর ২০২০ সালে শতভাগ, ২০১৯ সালে ৬৭ দশমিক ০৫, ২০১৮ সালে ৭৩ দশমিক ৭, ২০১৭ সালে ৭২ ভাগ, ২০১৬ সালে ৬৮ দশমিক ৫৯ ভাগ, ২০১৫ সালে ৭৪ দশমিক ৫৭ এবং ২০১৪ সালে ৭৯ দশমিক ১৬।
পাসের হারে সিলেট জেলা শীর্ষে, তলানিতে মৌলভীবাজার : এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফলে সিলেট শিক্ষা বোর্ডের চার জেলার মধ্যে এগিয়ে রয়েছে সিলেট। পাসের হার ও জিপিএ-৫ দুই সূচকেই জেলার অবস্থান শীর্ষে। অন্যদিকে পাসের হারে সবচেয়ে পিছিয়ে মৌলভীবাজার। আর জিপিএ-৫ পাওয়ার সংখ্যায় চার জেলার মধ্যে সর্বনিম্ন অবস্থানে রয়েছে সুনামগঞ্জ। বোর্ডের চার জেলার মধ্যে সিলেটের পাসের হারই কেবল সামগ্রিক গড়ের ওপরে রয়েছে।
বোর্ডের জেলাভিত্তিক ফলাফল পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, এ বছর সিলেট জেলায় পরীক্ষার্থী ছিলেন ৩০ হাজার ৯৫৭ জন। তাদের মধ্যে পাস করেছেন ১৭ হাজার ৮৩৭ জন। পাসের হার ৫৭ দশমিক ৬২ শতাংশ। এ জেলা থেকে জিপিএ-৫ পেয়েছেন ৯০৩ জন। সিলেট বোর্ডে মোট ১ হাজার ২০৪ জন জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর মধ্যে ৭৫ শতাংশের বেশি সিলেট জেলার।
অন্য তিন জেলার মধ্যে পাসের হারে সবচেয়ে পিছিয়ে মৌলভীবাজার। এ জেলা থেকে ১৪ হাজার ৫৭০ জন পরীক্ষায় অংশ নিয়ে পাস করেছেন মাত্র ৬ হাজার ৩৮৭ জন। পাসের হার ৪৩ দশমিক ৮৪ শতাংশ। তবে জেলাটি থেকে জিপিএ-৫ পেয়েছেন ১৫১ জন।
সুনামগঞ্জ জেলায় ১৩ হাজার ৬৬৭ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছেন ৬ হাজার ৬৮৭ জন। পাসের হার ৪৮ দশমিক ৯৯ শতাংশ। তবে জিপিএ-৫ পাওয়ার সংখ্যায় চার জেলার মধ্যে সবচেয়ে পিছিয়ে এ জেলা। এখান থেকে জিপিএ-৫ পেয়েছেন মাত্র ৪৬ জন। হবিগঞ্জ জেলায় ১২ হাজার ৬৯৯ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছেন ৬ হাজার ৭৯ জন। পাসের হার ৪৭ দশমিক ৩৪ শতাংশ। এ জেলা থেকে জিপিএ-৫ পেয়েছেন ১০৪ জন।
এদিকে জেলাভিত্তিক ফলাফলে ছেলে ও মেয়েদের পাসের হারের মধ্যেও পার্থক্য দেখা গেছে। চার জেলাতেই ছাত্রদের তুলনায় ছাত্রীদের পাসের হার বেশি। বিশেষ করে সুনামগঞ্জে ছাত্রদের পাসের হার ৪৩ দশমিক ৪০ শতাংশ হলেও ছাত্রীদের ক্ষেত্রে তা ৫২ দশমিক ৩৩ শতাংশ। হবিগঞ্জেও ছাত্রদের ৪১ দশমিক ৯২ শতাংশের বিপরীতে ছাত্রীদের পাসের হার ৫১ দশমিক ৭৩ শতাংশ।
ফলাফল খারাপ হওয়ার পেছনে অনিয়মিত পরীক্ষার্থীদের ভূমিকা রয়েছে বলে জানিয়েছেন সিলেট শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক প্রফেসর বিলকিস ইয়াছমীন। তিনি বলেন, এইবার ২১ বছরের মধ্যে রেজাল্টে ধস নেমেছে আপনারা যেটা বলছেন, আসলে আমি ওইভাবে বিশ্লেষণ করব না, আমি ধসের কথা বলব না। এবার যেটা হলো, যেমন আমরা এসএসসিতেও দেখেছি, আমাদের রেজাল্ট কিন্তু ওইভাবে আর যে আমি পরীক্ষার হলে বসলেই আমি পরীক্ষায় পাস করব, সেটা কিন্তু না। আমাদের বিভিন্ন ধরনের বিভিন্ন মানদণ্ড কিন্তু এখানে নির্ধারণ হচ্ছে।
পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক বলেন, স্কুল-কলেজে আমাদের নানাভাবে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে নির্দেশনা এসেছে, বাচ্চাদের পড়াশোনা করতে হবে। অন্য বোর্ডের রেজাল্টের তুলনায় আমাদের সিলেট শিক্ষা বোর্ডের রেজাল্ট আলহামদুলিল্লাহ অনেক ইমপ্রুভড। গতবার কিন্তু অভিন্ন প্রশ্ন ছিল না। এবার অভিন্ন প্রশ্ন।
পরীক্ষার্থীদের প্রস্তুতি ও খাতা মূল্যায়ন প্রসঙ্গে বিলকিস ইয়াছমীন বলেন, বাচ্চারাও পড়াশোনা করছে, বাচ্চারাও টেবিলমুখী হয়েছে, পড়ামুখী হয়েছে, কারণ মন্ত্রী মহোদয় ঘোষণা দিয়েছেন পড়তে হবে। সেই মোতাবেক আমাদের পরীক্ষক, নিরীক্ষক এবং হেড এক্সামিনার প্রত্যেকের যৌথ প্রচেষ্টাতেই কিন্তু একটা বাচ্চার রেজাল্ট হয়। আমরা বোর্ড কিন্তু কিছু জানি না, হেড এক্সামিনার, এক্সামিনার, নিরীক্ষক তিনজনের যৌথ কাজের মাধ্যমে কিন্তু একটা বাচ্চার রেজাল্ট প্রস্তুত হয়। তিনি আরও বলেন, এবার আসলে আমাদের পরীক্ষার্থীদের সংখ্যা অনিয়মিতরাই বেশি ছিল, অনেক বেশি অনিয়মিত পরীক্ষার্থী ছিল। আমাদের অনিয়মিত পরীক্ষার্থীদের কারণে রেজাল্টটা কিছুটা ডাউন হয়েছে। এবার অনিয়মিত পরীক্ষার্থী ১৯ হাজার ৭৬০ জন ছিল, পাস করেছে ৮ হাজার ৬৫১ জন।






