সিলেটে ডেঙ্গুর উদ্বেগজনক বিস্তার : মৌসুমের অর্ধেকের বেশি আক্রান্ত অক্টোবরে
প্রকাশিত হয়েছে : ০১ নভেম্বর ২০২৬, ১২:৩৫:৩১ অপরাহ্ন
১০ মাসে শনাক্ত ৮৭৭, ১ মাসেই ৪৬৭

এমজেএইচ জামিল : সিলেটে ডেঙ্গুর প্রকোপ ক্রমেই বাড়ছে। বছরের প্রথম ৯ মাসে বিভাগে যত রোগী শনাক্ত হয়েছিলেন, অক্টোবরের এক মাসেই আক্রান্ত হয়েছেন তার চেয়েও বেশি। জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৯ মাসে আক্রান্ত ছিলেন ৪১০ জন। অথচ অক্টোবরের ৩১ দিনেই নতুন করে শনাক্ত হয়েছেন ৪৬৭ জন। অর্থাৎ চলতি বছরের মোট আক্রান্তের অর্ধেকেরও বেশি রোগী শনাক্ত হয়েছেন শুধু অক্টোবর মাসে। সংক্রমণের এই ঊর্ধ্বগতির পাশাপাশি অক্টোবরে ডেঙ্গুতে একজনের মৃত্যুও হয়েছে। সব মিলিয়ে ১০ মাসে বিভাগে আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮৭৭ জনে, মৃত্যু হয়েছে পাঁচজনের। বর্তমানে বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন ৫৭ জন।
শনিবার (৩১ অক্টোবর) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সিলেট বিভাগীয় কার্যালয়ের পরিচালক ডা. মো. মাহবুবুল আলম এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
অক্টোবরে সংক্রমণের বিস্ফোরণ :
স্বাস্থ্য বিভাগের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, চলতি বছরের প্রথম সাত মাসে সিলেট বিভাগে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছিলেন ১০৫ জন। আগস্টে নতুন করে আক্রান্ত হন ৮৫ জন। সেপ্টেম্বরে শনাক্ত হন ২২০ জন। এতে সেপ্টেম্বর শেষে মোট আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়ায় ৪১০ জনে। কিন্তু অক্টোবরেই নতুন করে আক্রান্ত হয়েছেন ৪৬৭ জন। অর্থাৎ আগের নয় মাসের সম্মিলিত আক্রান্তের সংখ্যাকেও ছাড়িয়ে গেছে অক্টোবরের সংক্রমণ।
সেপ্টেম্বরের প্রথম ২১ দিনেই বিভাগে ১৪৪ জন ডেঙ্গুরোগী শনাক্ত হয়েছিলেন। তখন মোট আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ৩৩৪। ওই সময় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন ৩০ জন। এক মাসের ব্যবধানে সংক্রমণের চিত্র আরও উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে। অক্টোবরের ৩১ দিনে গড়ে প্রতিদিন ১৫ জনের বেশি রোগী শনাক্ত হয়েছেন। সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায়ও নতুন করে ২১ জনের ডেঙ্গু শনাক্ত হয়েছে। বর্তমানে হাসপাতালে ভর্তি ৫৭ জন।
আক্রান্তে শীর্ষে হবিগঞ্জ, সর্বনিম্ন মৌলভীবাজারে :
জেলা ভিত্তিক পরিসংখ্যানে ডেঙ্গু আক্রান্তের দিক থেকে সিলেট বিভাগের মধ্যে শীর্ষে রয়েছে হবিগঞ্জ। চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত জেলায় আক্রান্ত হয়েছেন ৩৬২ জন। দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা সিলেটে আক্রান্ত ২০৫ জন। সুনামগঞ্জ জেলায় ২০১ জন এবং মৌলভীবাজারে ৭৮ জন ডেঙ্গুরোগী শনাক্ত হয়েছেন। এছাড়া অন্যান্য জেলা থেকে এসে সিলেট বিভাগে চিকিৎসা নিতে গিয়ে আরও ৩১ জনের ডেঙ্গু শনাক্ত হয়েছে।
জেলাভিত্তিক হিসাবে দেখা যায়, মোট আক্রান্তের প্রায় ৪১ শতাংশই হবিগঞ্জের বাসিন্দা। সুনামগঞ্জ ও সিলেট জেলাতেও সংক্রমণ উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। বিশেষ করে উপজেলা পর্যায়ের স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতেও নতুন রোগী শনাক্ত হওয়ায় ডেঙ্গুর বিস্তার এখন শুধু নগরকেন্দ্রিক নেই; ছড়িয়ে পড়েছে বিভাগের বিভিন্ন এলাকায়।
ওসমানীসহ বিভিন্ন হাসপাতালে ৫৭ রোগী :
স্বাস্থ্য বিভাগের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় শনাক্ত ২১ জনের মধ্যে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৯, জালালাবাদ রাগীব-রাবেয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৩, লাখাই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ১, হবিগঞ্জ সদর হাসপাতালে ২, ধর্মপাশা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ১, শান্তিগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ১ এবং সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালে ৪ জন রয়েছেন।
বর্তমানে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ৫৭ জনের মধ্যে ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ১৬, জালালাবাদ রাগীব-রাবেয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ১১, নর্থ ইস্ট মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৩, মাউন্ট এডোরা হাসপাতালে ২, বানিয়াচং উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ১, লাখাই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ৪, মাধবপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ৩, হবিগঞ্জ সদর হাসপাতালে ৭, ধর্মপাশা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ২, শান্তিগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ২, সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালে ৪ এবং মৌলভীবাজার জেলা সদর হাসপাতালে ২ জন চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
মৃত্যু বেড়ে পাঁচ, অক্টোবরে দুই মৃত্যু :
চলতি বছরে সিলেট বিভাগে ডেঙ্গুতে পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে অক্টোবরে মারা গেছেন দুজন। সর্বশেষ গত ২৫ অক্টোবর ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায় হবিগঞ্জের চুনারুঘাট উপজেলার চার বছর বয়সী শিশু ফারদিন আহমদ। এর আগে ১৮ অক্টোবর একই হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান হবিগঞ্জের নবীগঞ্জ উপজেলার নেপাল চন্দ্র দাস (৫২)।
এর আগে ১৬ সেপ্টেম্বর জালালাবাদ রাগীব-রাবেয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মারা যান মৌলভীবাজারের জুড়ী উপজেলার ছলিমা বেগম (৬০)। ৮ সেপ্টেম্বর একই হাসপাতালে মারা যান হবিগঞ্জের বানিয়াচং উপজেলার কৃষ্ণ দাস (৪৫)। আর ২ আগস্ট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মারা যান আফিয়া খানম (৫৪)। অর্থাৎ সেপ্টেম্বর মাসে দুজন এবং অক্টোবর মাসে দুজনের মৃত্যু হয়েছে। আগস্টে প্রথম মৃত্যুর পর দুই মাসেই মৃত্যুর সংখ্যা বেড়েছে।
নিয়ন্ত্রণে বাড়তি নজরদারির তাগিদ :
স্বাস্থ্য সংশ্লিষ্টদের মতে, অক্টোবরজুড়ে আক্রান্তের এই অস্বাভাবিক বৃদ্ধি ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমের জন্য বড় সতর্কবার্তা। বিশেষ করে হবিগঞ্জ ও সুনামগঞ্জের বিভিন্ন উপজেলা এবং সিলেট নগরীর সংক্রমণ পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন। রোগী শনাক্তের পাশাপাশি আক্রান্তের বাড়ি ও আশপাশের এলাকায় এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংসে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। নিয়মিত অভিযান এবং জনসচেতনতা বাড়ানো জরুরি। একই সঙ্গে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে শুরু করে মেডিকেল কলেজ ও বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসা প্রস্তুতি নিশ্চিত করার প্রয়োজন রয়েছে।
আগের ২৪ ঘণ্টায় বিভাগে ডেঙ্গুতে কোনো মৃত্যুর ঘটনা না ঘটলেও ১০ জন রোগী শনাক্ত হয়েছিলেন। পরবর্তী ২৪ ঘণ্টায় শনাক্তের সংখ্যা বেড়ে ২১ হওয়ায় সংক্রমণের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা স্পষ্ট হয়েছে। বছরের মোট আক্রান্তের অর্ধেকের বেশি এক মাসে শনাক্ত হওয়ার এই চিত্র সিলেটে ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
সিলেট সিটি কর্পোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. জাহিদুল ইসলাম বলেন, সিলেট আক্রান্তের সংখ্যা বাড়লেও অধিকাংশের ট্রাভেল হিস্ট্রি রয়েছে। আর আক্রান্ত ব্যক্তির মাধ্যমে বাসার অন্যজনের শরীরেও ডেঙ্গু ছড়িয়ে পড়ার শঙ্কা রয়েছে। সিসিকের পক্ষ থেকে নিয়মিত মশক নিধন অভিযানের পাশাপাশি বিশেষ ডেঙ্গু প্রতিরোধ অভিযান চলমান রয়েছে।
তিনি বলেন, আমরা দায়িত্ব পালন করছে। ডেঙ্গুর প্রকোপ থেকে রক্ষায় জনসাধারণকেও সতর্ক থাকতে হবে। ছাদ, নির্মাণাধীন ভবন, ফুলের টব, পরিত্যক্ত পাত্র, টায়ার ও ড্রেনসহ বিভিন্ন স্থানে জমে থাকা পানি অপসারণে সবাইকে সচেতন হতে হবে।





