অধিকাংশ কারখানায় কাজে ফিরেছেন শ্রমিকরা
প্রকাশিত হয়েছে : ০৬ নভেম্বর ২০২৬, ১২:৪২:০৮ অপরাহ্ন
আশুলিয়ায় ৭০ কারখানায় ছুটি

জালালাবাদ ডেস্ক: টানা কয়েক দিনের শ্রমিক অসন্তোষ ও সংঘর্ষের পর সাভার-আশুলিয়া ও নারায়ণগঞ্জের অধিকাংশ পোশাক কারখানায় কাজে ফিরেছেন শ্রমিকরা। বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) সকালে অধিকাংশ কারখানায় উৎপাদন শুরু হলেও আশুলিয়ার কয়েকটি এলাকায় বিক্ষোভ, ভাঙচুর ও পুলিশের সঙ্গে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। নিরাপত্তাশঙ্কায় আশুলিয়ায় ৭০টি কারখানায় সাময়িক ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে।
এদিকে, রাজধানীর মিরপুরে শ্রমিক আন্দোলন চলাকালে পুলিশ সদস্যদের ওপর হামলার ঘটনায় আরও আটজনকে গ্রেপ্তার করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। সব মিলিয়ে শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে চলমান আন্দোলনে একদিকে কর্মস্থলে ফেরার প্রবণতা, অন্যদিকে বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে নিরাপত্তা জোরদার—দুই চিত্রই দেখা যাচ্ছে।
আশুলিয়ায় ১ হাজার ৮৬৩ কারখানার মধ্যে বন্ধ ৭০টি
শিল্পাঞ্চল সাভার-আশুলিয়ার অধিকাংশ পোশাক কারখানায় বৃহস্পতিবার সকালে স্বাভাবিক কর্মচাঞ্চল্য দেখা গেছে। উলাইল, রেডিও কলোনি, হেমায়েতপুর, পল্লী বিদ্যুৎ, বাইপাইল ও কাঠগড়া এলাকায় সকাল ৮টার দিকে শ্রমিকেরা কাজে যোগ দেন। তবে নিশ্চিন্তপুর ও নরসিংহপুরসহ কয়েকটি এলাকার শ্রমিকেরা কাজে যোগ দেওয়ার পর কারখানা থেকে বেরিয়ে বিক্ষোভে অংশ নেন। কোথাও কোথাও সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়।
শিল্প পুলিশ-১-এর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মোমিনুল ইসলাম ভূঁইয়া জানান, তাঁর আওতাধীন ১ হাজার ৮৬৩টি কারখানার মধ্যে বৃহস্পতিবার ৭০টিতে সাময়িক ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। বাকি কারখানাগুলোতে উৎপাদন কার্যক্রম চালু রয়েছে।
সকালে আশুলিয়ার জামগড়া এলাকায় আব্দুল্লাহপুর-বাইপাইল সড়কে বিক্ষোভ করেন শ্রমিকদের একটি অংশ। পুলিশ তাঁদের সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করলে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া হয়। এ সময় বিক্ষোভকারীদের ইটপাটকেল নিক্ষেপে শিল্প পুলিশের একটি গাড়ির কাচ ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ কাঁদানে গ্যাসের শেল ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে।
এ ছাড়া আশুলিয়ার দোসাইদ এলাকায় ফেব্রিকা নিট কম্পোজিটের সামনে কয়েক শ বিক্ষোভকারী জড়ো হয়ে কারখানাটির দুটি ফটক ভাঙচুর করেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। পরে ওই কারখানাসহ আশপাশের কয়েকটি কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়।
গাজীপুরে শ্রমিক তৌফিক হোসেনের মৃত্যুর প্রতিবাদেও আশুলিয়ায় বিক্ষোভ হয়েছে। জিরাবো থেকে প্রায় আড়াই হাজার শ্রমিক মিছিল নিয়ে এনভয় কারখানার দিকে যান। শিল্প পুলিশ জানিয়েছে, মিছিলটি শান্তিপূর্ণ ছিল।
শিল্পাঞ্চলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পুলিশ ও বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) সদস্যদের মোতায়েন রাখা হয়েছে। ৫ বিজিবির অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল তৈমুর হাসান খান জানান, সাভার ও আশুলিয়ায় সার্বিক নিরাপত্তায় পাঁচ প্লাটুন বিজিবি সদস্য দায়িত্ব পালন করছেন।
নারায়ণগঞ্জে ফিরেছে কর্মচাঞ্চল্য
টানা তিন দিনের শ্রমিক বিক্ষোভ, সড়ক অবরোধ ও পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের পর নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায়ও পরিস্থিতি অনেকটা স্বাভাবিক হয়েছে। বৃহস্পতিবার সকাল থেকে কাঠেরপুল, রামারবাগ, শিবু মার্কেট ও নয়ামাটি এলাকার অধিকাংশ পোশাক কারখানায় শ্রমিকদের কাজে যোগ দিতে দেখা গেছে। সড়কে যানবাহন চলাচলও স্বাভাবিক হয়েছে।
তবে নতুন করে অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। শিবু মার্কেট ও আশপাশের সড়কে বিজিবির টহলও দেখা গেছে।
বাংলাদেশ ট্রাস্ট ওয়ার্কার্স ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সভাপতি এফ এম আবু সাঈদ বলেন, পরিস্থিতি আপাতত শান্ত রয়েছে এবং শ্রমিকেরা কাজে ফিরেছেন। তবে মজুরি বোর্ডের সিদ্ধান্ত ঘোষণার পরও বিভিন্ন মহলের উসকানিতে শ্রমিকদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরির আশঙ্কা রয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার তারেক আল মেহেদী জানান, পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের মোতায়েন রাখা হয়েছে।
মিরপুরে ডিবির অভিযানে গ্রেপ্তার ৮
রাজধানীর মিরপুরে শ্রমিক আন্দোলন চলাকালে দায়িত্ব পালনরত পুলিশ সদস্যদের ওপর হামলার ঘটনায় আরও আটজনকে গ্রেপ্তার করেছে ডিবি। বৃহস্পতিবার ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) মুখপাত্র ও উপপুলিশ কমিশনার মো. আকতার হোসেন গ্রেপ্তারের তথ্য নিশ্চিত করেন।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, গত ৩ নভেম্বর মিরপুর-১১ এলাকায় শ্রমিকদের বিক্ষোভ চলাকালে এক পুলিশ সদস্যকে ঘিরে ধরে লাঠি ও ইটপাটকেল দিয়ে মারধর করা হয়। এতে ওই সদস্য গুরুতর আহত হন। ঘটনার ভিডিও ফুটেজ পর্যালোচনা ও প্রযুক্তির সহায়তায় হামলায় জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের নাম-পরিচয় তাৎক্ষণিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি।
পোশাকশ্রমিকদের অন্যতম প্রধান দাবি মাসিক ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণ। এর পাশাপাশি অন্যায়ভাবে ছাঁটাই বন্ধ, শ্রমিকদের কালো তালিকাভুক্তি বন্ধ এবং আটক শ্রমিকদের মুক্তির দাবিও জানানো হচ্ছে।
গত কয়েক দিন ধরে সাভার-আশুলিয়া, গাজীপুর, মিরপুর ও নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে বিক্ষোভ, সড়ক অবরোধ ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এর মধ্যে কয়েক শ কারখানায় বিভিন্ন সময়ে ছুটি ঘোষণা করা হয়। বৃহস্পতিবার অধিকাংশ কারখানায় উৎপাদন শুরু হলেও কিছু এলাকায় বিক্ষোভ ও নিরাপত্তাশঙ্কা অব্যাহত রয়েছে।
পুলিশের ঢাকা রেঞ্জের উপমহাপরিদর্শক মুস্তাফিজুর রহমান জানিয়েছেন, ঢাকা রেঞ্জের আওতাধীন গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ ও সাভারের অধিকাংশ এলাকায় কাজকর্ম চলছে। আশুলিয়ার কয়েকটি কারখানা ছাড়া অন্যত্র উৎপাদন কার্যক্রম চালু রয়েছে। শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পোশাকধারী পুলিশের পাশাপাশি সাদাপোশাকেও পুলিশ দায়িত্ব পালন করছে।
শিল্পাঞ্চলগুলোতে উৎপাদন স্বাভাবিক রাখা, শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং শ্রমিকদের দাবিদাওয়া আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের বিষয়টি এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।





