মালিক ধর্মঘট স্থগিত, শ্রমিক অনড় অবস্থান
প্রকাশিত হয়েছে : ০২ অক্টোবর ২০২৬, ৭:৪৫:৪৫ অপরাহ্ন

হবিগঞ্জ সংবাদদাতা: হবিগঞ্জে বাস মালিকদের ডাকা অনির্দিষ্টকালের পরিবহন ধর্মঘট স্থগিত করা হলেও সড়কে বাস নামাতে রাজি নন শ্রমিকেরা। ফলে শুক্রবারও হবিগঞ্জ-সিলেটসহ জেলার বিভিন্ন রুটে বাস চলাচল বন্ধ রয়েছে। এতে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন সাধারণ যাত্রীরা। তবে হবিগঞ্জ-ঢাকা রুটে কয়েকটি বাস ঢাকার উদ্দেশে ছেড়ে গেছে।
হবিগঞ্জ-মৌলভীবাজার-সিলেট সড়কে বাস আটকে দেওয়া এবং মালিক-শ্রমিক বিরোধের জেরে বৃহস্পতিবার সকাল থেকে অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘটের ডাক দেয় হবিগঞ্জ মোটর মালিক গ্রুপ। ধর্মঘটের কারণে জেলার অভ্যন্তরীণ ও দূরপাল্লার অধিকাংশ রুটে বাস চলাচল বন্ধ হয়ে যায়।
শুক্রবার সকালে হবিগঞ্জ মোটর মালিক গ্রুপের সাধারণ সম্পাদক আবু মঈন চৌধুরী জানান, বাংলাদেশ বাস মালিক সমিতির কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক শিমুল বিশ্বাসের অনুরোধে তাঁরা ধর্মঘট স্থগিত করেছেন। আগামী রোববার ঢাকায় হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজারের বাস মালিক সমিতির নেতাদের নিয়ে বৈঠকের কথা রয়েছে। ওই বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
তবে শ্রমিকেরা ধর্মঘট স্থগিতের সিদ্ধান্ত মেনে বাস চালাতে রাজি হচ্ছেন না। ফলে মালিকদের ঘোষণার পরও সড়কে বাস চলাচল স্বাভাবিক হয়নি।
শুক্রবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে হবিগঞ্জ পৌর বাস টার্মিনালে গিয়ে দেখা যায়, সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে আছে যাত্রীবাহী বাস। টার্মিনালে শ্রমিকদের জটলা। বাস চালানো হবে কি না, তা নিয়ে নিজেদের মধ্যে আলোচনা করছিলেন তাঁরা। এদিকে জেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে গন্তব্যে যাওয়ার জন্য যাত্রীরা টার্মিনালে এসে বাস না পেয়ে বিপাকে পড়েন।
পরিবহনশ্রমিক জাহাঙ্গীর মিয়া বলেন, ‘বাস মালিক সমিতি ধর্মঘটের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে শ্রমিকদের সঙ্গে আলোচনা করেনি। এখন বাস নিয়ে সড়কে বের হলে বিভিন্ন জায়গায় শ্রমিকেরাই আগে হামলার শিকার হতে পারেন। আমাদের নিরাপত্তার দায়িত্ব কে নেবে? তাই ঝুঁকি নিয়ে বাস চালাতে চাই না।’
জানা গেছে, হবিগঞ্জের বিরতিহীন এক্সপ্রেস বাসের মালিক ও শ্রমিকদের সঙ্গে মৌলভীবাজারের এসএমএস পরিবহনের মালিক-শ্রমিকদের দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছে। এ বিরোধকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন সময়ে বাস চলাচলে বাধা, যানবাহন ভাঙচুর ও শ্রমিকদের মারধরের অভিযোগ রয়েছে।
সর্বশেষ গত ১১ ও ২৪ সেপ্টেম্বর সিলেট থেকে মৌলভীবাজার যাওয়ার পথে হবিগঞ্জের তিনটি বিরতিহীন এক্সপ্রেস বাস আটকে রাখার ঘটনা ঘটে। বিষয়টি সমাধানে প্রশাসনের উদ্যোগে একাধিকবার আলোচনা হলেও স্থায়ী সমাধান হয়নি। এর পরিপ্রেক্ষিতে বুধবার হবিগঞ্জ মোটর মালিক গ্রুপ গণমাধ্যমে ধর্মঘটের ঘোষণা দেয়। একই দিন সিলেটের বিভাগীয় কমিশনারের কাছে স্মারকলিপিও দেওয়া হয়।
এদিকে বাস বন্ধ থাকায় সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন রোগী, চাকরিপ্রার্থী, শিক্ষার্থী ও দূরপাল্লার যাত্রীরা।
বানিয়াচং থেকে ছোট সন্তানদের নিয়ে হবিগঞ্জ শহরে এসেছিলেন শাহানা আক্তার। তাঁর এক সন্তানের চিকিৎসা পরীক্ষা করাতে হবে। পাশাপাশি সিলেটের শাহপরাণ এলাকায় থাকা স্বামীর কাছে যাওয়ার কথা ছিল তাঁর। বাসস্ট্যান্ডে এসে বাস চলাচল বন্ধের খবর পেয়ে হতাশ হয়ে পড়েন তিনি।
শাহানা আক্তার বলেন, ‘ছোট ছোট বাচ্চাদের নিয়ে ভ্রমণ করাই কঠিন। এর মধ্যে আমার একটি অসুস্থ সন্তান রয়েছে। তার ডাক্তারি পরীক্ষা করাতে হবে। স্বামীর কাছেও যেতে হবে। এতদূর এসে কোনো বাস না পেয়ে আমি অসহায় হয়ে পড়েছি।’
সিলেটগামী যাত্রী শফিকুল ইসলাম জানান, আগে থেকেই তিনি ট্রেনের টিকিট করেছিলেন। কিন্তু বাস বন্ধ থাকায় সময়মতো শায়েস্তাগঞ্জ রেলস্টেশনে পৌঁছাতে পারেননি।
একইভাবে চাকরির পরীক্ষায় অংশ নিতে না পেরে হতাশ হয়েছেন বানিয়াচংয়ের গৌতম দাস (২২)। শুক্রবার সকাল ১০টায় সিলেটের একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে তাঁর চাকরির পরীক্ষা ছিল। ভোর ৬টায় হবিগঞ্জ পৌর বাস টার্মিনালে এসে বাস না পেয়ে প্রায় দুই ঘণ্টা অপেক্ষা করেন তিনি।
গৌতম দাস বলেন, ‘অনেক আশা নিয়ে চাকরির পরীক্ষায় অংশ নিতে সিলেটে যাচ্ছিলাম। কিন্তু বাস না চলায় শেষ পর্যন্ত পরীক্ষায় অংশ নিতে পারলাম না।’
এদিকে মালিকপক্ষ ধর্মঘট স্থগিত করলেও শ্রমিকদের অনড় অবস্থানের কারণে কবে নাগাদ হবিগঞ্জ-সিলেটসহ অন্যান্য রুটে বাস চলাচল স্বাভাবিক হবে, তা এখনো নিশ্চিত নয়। রোববারের বৈঠকের দিকে তাকিয়ে রয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।






