সৌন্দর্য হারাচ্ছে সিলেটের পর্যটনকেন্দ্রগুলো
প্রকাশিত হয়েছে : ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৭:৪৫:১৪ অপরাহ্ন
জালালাবাদ রিপোর্ট: পাহাড়ের বুক চিরে নেমে আসা স্বচ্ছ জলধারা, নদীর বুকে বিছানো ধবধবে সাদা পাথর, দূরের মেঘে ঢাকা পাহাড় আর চারপাশের সবুজের সমারোহÑ প্রকৃতির এমন বৈচিত্র্যের নাম সিলেট। জাফলং, বিছানাকান্দি, সাদাপাথর, রাতারগুল, লালাখাল ও পান্তুমাইÑ প্রতিটি পর্যটনকেন্দ্রই যেন প্রকৃতির আলাদা একেকটি ছবি। তবে নির্বিচারে বালু-পাথর উত্তোলন, পাহাড় কাটা, যত্রতত্র প্লাস্টিক-বর্জ্য ফেলা ও অপরিকল্পিত স্থাপনা নির্মাণে দিন দিন সেই সৌন্দর্য হারাচ্ছে।
প্রকৃতি যেখানে সিলেটকে দুহাত ভরে দিয়েছে, সেখানে মানুষের অব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি বিনাশী কর্মকাণ্ড পর্যটনকেন্দ্রগুলোর অস্তিত্বের জন্য হুমকি হয়ে উঠেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সিলেটের পর্যটন বিকাশে প্রয়োজন সমন্বিত মহাপরিকল্পনা। এখনই প্রকৃতি ও পরিবেশ রক্ষায় কার্যকর উদ্যোগ না নিলে ভবিষ্যতে পর্যটন খাত বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়তে পারে।
সিলেটে আসা পর্যটকদের ভ্রমণ তালিকার শীর্ষে থাকে জাফলং। সেখানে পৌঁছানোর আগেই সীমান্তের ওপারের সারি সারি পাহাড় ও পাহাড়ের চূড়া থেকে নেমে আসা সাদা ঝরনা পর্যটকদের মুগ্ধ করে। পিয়াইন নদীর স্বচ্ছ জলরাশি, ডাউকি ঝুলন্ত সেতু, মায়াবী ঝরনা, দেশের প্রথম সমতল চা-বাগান এবং খাসিয়া সম্প্রদায়ের বৈচিত্র্যময় জীবনধারা জাফলংয়ের আকর্ষণ বাড়িয়েছে। তবে বালু-পাথর উত্তোলন, দখল ও অপরিকল্পিত স্থাপনা নির্মাণের কারণে পরিবেশগতভাবে সংকটাপন্ন এলাকা হিসেবে চিহ্নিত জাফলং এখন প্রকৃতি রক্ষার প্রশ্নে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে।
জাফলংয়ের পর পর্যটকদের কাছে জনপ্রিয় গন্তব্য সাদাপাথর। ধবধবে সাদা পাথরের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া স্বচ্ছ জলস্রোত, আকাশের গায়ে হেলান দেওয়া পাহাড় আর মাথার ওপর ভেসে থাকা মেঘের দৃশ্য সহজেই মুগ্ধ করে ভ্রমণপিপাসুদের। কিন্তু বালু-পাথর উত্তোলনের কারণে সাদাপাথরেও পড়েছে কালো ছায়া। এতে ধলাই নদী হারাচ্ছে তার স্বাভাবিক গতিপথ, নষ্ট হচ্ছে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য।
একইভাবে জল-পাথরের বিছানাকান্দিও রয়েছে দুরবস্থায়। যোগাযোগব্যবস্থার দুর্বলতা, পর্যটনকেন্দ্র থেকে অবাধে পাথর উত্তোলন এবং পরিবেশবিনাশী কর্মকাণ্ডের কারণে একসময়কার আকর্ষণীয় এ পর্যটনকেন্দ্রটির পরিবেশও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
সিলেটের পর্যটনে ভিন্নমাত্রা যোগ করেছে মিঠাপানির জলাবন রাতারগুল। বর্ষায় পানিতে গলা ডুবিয়ে থাকা সারি সারি গাছ, গাছের ডালে পাখির ডাক, বিভিন্ন প্রাণীর বিচরণ, নৌকার বৈঠার শব্দ আর চারপাশের নীরবতা তৈরি করে ভিন্ন এক পরিবেশ। তবে নৌযানের সংখ্যা বৃদ্ধি, পানিতে বর্জ্য ফেলা, শব্দদূষণ ও অপরিকল্পিত কার্যক্রমের কারণে রাতারগুলের জীববৈচিত্র্যও হুমকির মুখে পড়েছে।
পাহাড়ের কোলে আঁকা জলরঙের ছবির মতো লালাখালের পান্না সবুজ স্বচ্ছ পানি নৌকায় ভ্রমণ করা পর্যটকদের মুগ্ধ করে। সীমান্তঘেঁষা পান্তুমাইয়ের পাহাড় থেকে নেমে আসা জলপ্রপাতও পর্যটকদের অন্যতম আকর্ষণ। বর্ষায় জলধারা প্রবল হয়ে উঠলে দূর থেকেই শোনা যায় পানির গর্জন। তবে লালাখাল ও পান্তুমাইয়ের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য রক্ষায়ও সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে কার্যকর উদ্যোগের ঘাটতি রয়েছে।
এর বাইরে সিলেটের চা-বাগান, খাদিমনগর জাতীয় উদ্যান, হাকালুকি হাওর এবং হজরত শাহজালাল (রহ.) ও হজরত শাহপরান (রহ.)-এর মাজারসহ ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় স্থাপনাগুলোও পর্যটনের আকর্ষণ বাড়িয়েছে। প্রকৃতি, ইতিহাস, ধর্ম ও সংস্কৃতিকে ঘিরে সিলেটে পর্যটনশিল্প বিকাশের ব্যাপক সুযোগ থাকলেও সেই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগের ঘাটতি রয়েছে।
সিলেটের পর্যটন বিকাশের সবচেয়ে বড় অন্তরায় দুর্বল যোগাযোগব্যবস্থা। বেহাল সিলেট-ঢাকা মহাসড়ক, ট্রেনের টিকিট সংকট এবং আকাশপথে তুলনামূলক বেশি ভাড়ার কারণে অনেকেই আগ্রহ থাকা সত্ত্বেও সিলেট ভ্রমণে আসেন না। আর যারা পরিবার নিয়ে আসেন, তাদেরও যাতায়াতে ভোগান্তি পোহাতে হয়। পাশাপাশি পরিবেশ ও প্রকৃতি বিনাশী কর্মকাণ্ড বন্ধে জোরালো উদ্যোগ না থাকায় দিন দিন সৌন্দর্য হারাচ্ছে পর্যটনকেন্দ্রগুলো।
সিলেটের জেলা প্রশাসক আবদুল্লাহ আল মামুন গণমাধ্যমে জানান, পর্যটন মন্ত্রণালয়সহ সরকারের পর্যটনসংশ্লিষ্ট সব বিভাগের সঙ্গে সমন্বয় করে জেলা প্রশাসন কাজ করছে। সিলেটে নতুন নতুন পর্যটন সম্ভাবনা কাজে লাগাতে জেলা প্রশাসন আন্তরিক রয়েছে। কয়েক দিন আগে জৈন্তাপুরে একটি পর্যটন সম্ভাবনাময় স্থানের সন্ধান পাওয়ার পর সেখানে রাস্তা নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এছাড়া পর্যটনের বিকাশে সিলেট থেকে তামাবিল পর্যন্ত রেললাইন সম্প্রসারণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।





