‘বাণিজ্য যুদ্ধে’ সাফল্য পেয়েছে বাংলাদেশ
প্রকাশিত হয়েছে : ০৪ আগস্ট ২০২৫, ১২:৩২:১২ অপরাহ্ন

বাংলাদেশের ওপর আরোপিত যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা শুল্কের হার শেষ পর্যন্ত ২০ শতাংশ নির্ধারিত হয়েছে। নতুন এই শুল্ক হার ৭ আগস্ট থেকে কার্যকর হবে। বাণিজ্য বিশ্লেষক ও ব্যবসায়ীদের মতে, এই শুল্ক হার স্বস্তিদায়ক। লক্ষণীয় যে, ২৯ জুলাই থেকে তিন দিনের আলোচনা ও দর কষাকষির শেষ দিন ৩১ জুলাই এ ঘোষণার আগে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একটি নির্বাহী আদেশে সই করেন। এতে বাংলাদেশসহ বিশে^র ৭০টি দেশের ওপর ১০ থেকে ৪১ শতাংশ পর্যন্ত পাল্টা শুল্ক আরোপের ঘোষণা আসে। পাল্টা শুল্কের হার ৩৫ শতাংশ থেকে নামিয়ে আনতে বাংলাদেশের দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্রকেও বেশ কিছু সুবিধা দিতে হয়েছে। একদিকে সরকারী ও বেসরকারী পর্যায়ে দেশটি থেকে আমদানি বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের পণ্য বাংলাদেশে প্রবেশের শুল্কহার প্রায় শূন্য শতাংশ করে দেওয়া হয়েছে। প্রথমে গত ২ এপ্রিল বাংলাদেশের ওপর আরোপ করা হয় ৩৭ শতাংশ পাল্টা শুল্ক। মাঝখানে ৩ মাস স্থগিত রাখার পর ৮ জুলাই তা কমিয়ে ট্রাম্প ৩৫ শতাংশ করেন। বর্তমানে গড়ে ১৫ শতাংশ শুল্ক দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে পণ্য রপ্তানি করে বাংলাদেশ। নতুন পাল্টা শুল্ক ২০ শতাংশ করায় মোট শুল্ক হার দাঁড়াবে এখন ৩৫ শতাংশ। দর কষাকষির মাধ্যমে ঘোষিত শুল্কহার কমিয়ে আনাকে ঐতিহাসিক চুক্তি আখ্যা দিয়ে বাংলাদেশের আলোচকদের অভিনন্দন জানিয়েছেন। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনুস। তিনি বলেছেন, এটি সুস্পষ্ট এক কূটনৈতিক সাফল্য।
ওয়াশিংটনে দর কষাকষিতে অংশ নেয়া বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ড. খলিলুর রহমান বলেন, পাল্টা শুল্ক কমার যে সিদ্ধান্ত হয়েছে, তাতে বাংলাদেশ বড়ো ধরণের অনিশ্চয়তা থেকে রেহাই পেয়েছে। তিনি আরো বলেন, প্রধান প্রতিযোগী দেশগুলোর সমান অথবা কিছুটা বেশী এবং ভারতের চেয়ে ৫ শতাংশ কম হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্য এখন প্রতিযোগীতামূলক থাকবে। তৈরী পোশাক শিল্প ও এর ওপর নির্ভরশীল লাখ লাখ মানুষের জন্য এটি অত্যন্ত স্বস্তিকর ঘটনা। বাংলাদেশের ওপর ট্রাম্প প্রশাসনের ৩৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ নিয়ে ভারতের মিডিয়াগুলো ঠাট্টা বিদ্রুপ করেছিলো। এমনকি বাংলাদেশের ওপর ট্রাম্পের এই শুল্ক আরোপের বাংলাদেশ সম্পর্কে ট্রাম্পের বিরূপ মনোভাবের প্রকাশ বলে তারা প্রচার করেছিলো। কিন্তু বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশির উদ্দীনের মতো দক্ষ ব্যক্তির সফল কূটনৈতিক পদক্ষেপের ফলে ট্রাম্প প্রশাসন শুল্কের পরিমাণ ২০ শতাংশে নামিয়ে আনে। আর এই খবর প্রকাশের পর বাণিজ্য প্রতিদ্বন্দ্বী ভারতের শেয়ার বাজারে পতন নেমে আসে। বাংলাদেশের ওপর ট্রাম্পের ভারতের চেয়ে কম শুল্ক আরোপের পদক্ষেপটি ভারতীয় মিডিয়ার মুখে ঝামা ঘসে দিয়েছে, এমন অভিমত সচেতন মহলের এখন যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি পোশাক রপ্তানীতে ভারতকে যে বাংলাদেশের সাথে কঠিন প্রতিযোগীতায় অবতীর্ণ হতে হবে এতে কোন সন্দেহ নেই।
যুক্তরাষ্ট্র থেকে কম শুল্কহার লাভের বিনিময়ে বাংলাদেশকেও বেশ কিছু ছাড় ও সুবিধা দিতে হয়েছে। সরকারী ও বেসরকারী পর্যায়ে আমদানি বাড়ানোর উদ্যোগের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র থেকে পণ্য আমদানিতে শুল্ক হার প্রায় শূন্য করে দেয়া হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে দেশটি থেকে দাম বেশি দিয়ে হলেও বছরে ৭ লাখ টন গম কেনা হবে ও বছরে। ইতোমধ্যে ২ লাখ ২০ হাজার টন গম কেনার প্রস্তাব অনুমোদন করেছে সরকারী ক্রয় সংক্রান্ত কমিটি। দেশটি থেকে এলএনজি আগে থেকেই আমদানি করা হচ্ছে। তা বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। আর যুক্তরাষ্ট্রের বহুজাতিক কোম্পানী বোয়িং থেকে উড়োজাহাজ কেনার সংখ্যা বাড়িয়ে ২৫ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে অন্তর্বতী সরকার। প্রকৃত পক্ষে বাংলাদেশ খুব কম পণ্য সামগ্রী আমদানি করে যুক্তরাষ্ট্র থেকে। তাই যুক্তরাষ্ট্রকে শুল্ক হার কমালে বা মওকুফ করে দিলেও বাংলাদেশের তেমন কোন ক্ষয়ক্ষতি হবে না। আর এলএনজি তো বাংলাদেশের অবশ্যই প্রয়োজন। এছাড়া বোয়িং কেনারও যথেষ্ট প্রয়োজন আছে বাংলাদেশের। বিমানকে উন্নত ও সম্প্রসারিত করতে এবং লাভজনক করতে এয়ারক্রাফট দরকার। তবে এগুলোর পরিচালনার সুব্যবস্থা করতে হবে। আশা করা যায় অন্তর্বতী সরকারের সংশ্লিষ্ট উপদেষ্টারা সততা ও দক্ষতার সাথে বিমান সংস্থাকে পরিচালনা করলে এই জাতীয় পতাকাবাহী প্রতিষ্ঠানটি অচিরেই একটি লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হবে, অতীতে দুর্নীতিজনিত ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে ওঠতে সক্ষম হবে। সব মিলিয়ে অন্তর্বর্তী সরকার যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বাণিজ্যযুদ্ধ তথা বাণিজ্যিক কূটনীতির খেলায় যে একটি বড়ো সফলতা পেয়েছে, এতে কোন সন্দেহ নেই।



