সুনামগঞ্জে আকস্মিক বন্যার শঙ্কা, চতুর্মুখী সংকটে কৃষক
প্রকাশিত হয়েছে : ২৫ এপ্রিল ২০২৬, ৬:২৩:৫১ অপরাহ্ন
জসীম উদ্দিন, সুনামগঞ্জ : সুনামগঞ্জের বিস্তীর্ণ হাওরজুড়ে এবার সোনালি স্বপ্ন নিয়ে এসেছে বোরো ধানের বাম্পার ফলন। কিন্তু সেই স্বপ্নের ফসল ঘরে তোলার আগেই কৃষকের সামনে দেখা দিয়েছে একের পর এক সংকট। ধানের ন্যায্যমূল্য না পাওয়া, শ্রমিক সংকট, হারভেস্টার মেশিনের সীমাবদ্ধতা, ডিজেলের উচ্চমূল্য এবং নতুন করে যুক্ত হয়েছে আকস্মিক বন্যার আশঙ্কা। ফলে আনন্দের বদলে এখন হাওরজুড়ে বিরাজ করছে উৎকণ্ঠা।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের মামুন হাওলাদার স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে জানা যায়, ২৭ এপ্রিল মাঝারি হতে ভারী বৃষ্টি এবং ২৮ থেকে ৩০ এপ্রিল ভারী হতে অতি ভারী বৃষ্টিপাতের পূর্ভাবাস রয়েছে। প্রধান নদীসমুহে বিপদসীমার ওপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হতে পারে। ফলে ২৮ এপ্রিল থেকে সুনামগঞ্জ জেলায় আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি আছে। এতে করে হাওরে ফসলের ক্ষতির আশংকা আছে। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, হাওরে যে সকল জমির ধান ৮০ শতাংশ পেকে গেছে সে সকল জমির ধান দ্রুত কাটার অনুরোধ করা হয়।
হাওর ঘুরে দেখা গেছে, দিগন্তজোড়া ধানক্ষেত সোনালি রঙে ছেয়ে গেছে। কোথাও কোথাও কৃষক নির্বিঘ্নে ধান কাটতে পারলেও অনেক এলাকায় জলাবদ্ধতার কারণে ধান কাটতে পারছেন না। জমিতে পানি জমে থাকায় হারভেস্টার মেশিন প্রবেশ করতে পারছে না, আবার শ্রমিকের তীব্র সংকট পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
শনির হাওরের কৃষক মশিউর রহমান জানান, জমিতে পানি জমে আছে। হারভেস্টার দিয়ে ধান কাটা যাচ্ছে না। শ্রমিকও পাওয়া যাচ্ছে না। বাধ্য হয়ে ১৫০০ টাকা মজুরি দিয়ে শ্রমিক আনতে হচ্ছে। ধান চাষে প্রতি বিঘায় প্রায় ১২ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। কিন্তু ধানের দাম কম, খরচ বেশি সব মিলিয়ে লোকসানের মুখে পড়েছি।
ছায়ার হাওরের কৃষক মাহবুবুর রহমান বলেন, আমি ১০০ বিঘা জমিতে চাষ করেছি। কিছু ধান কাটা হয়েছে, বাকিটা কাটতে আরও সময় লাগবে। কিন্তু আবহাওয়ার পূর্বাভাসে বলা হচ্ছে ২৭-২৮ এপ্রিল ভারী বৃষ্টিপাত হতে পারে। বন্যা হলে ফসল ঘরে তোলা সম্ভব হবে না। তখন পরিবার নিয়ে কীভাবে বাঁচব, সেই চিন্তায় আছি।
দেখার হাওরের কৃষক রাজুও একই আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, ধানের ফলন ভালো হয়েছে, কিন্তু বাজারে প্রতিমণ ধান ৮০০ টাকায় বিক্রি করতে হচ্ছে। এতে লাভ তো দূরের কথা, পুরোপুরি লোকসান। তার ওপর যদি বন্যা আসে, তাহলে সব শেষ হয়ে যাবে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক ওমর ফারুক জানান, এ বছর সুনামগঞ্জের ১৩৭টি হাওরে ২ লাখ ২৩ হাজার ৫১১ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে প্রায় ১৪ লাখ মেট্রিক টন, যার বাজারমূল্য প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা। এ পর্যন্ত হাওরে ৫৩ হাজার ৬ শত ৪০ হেক্টর জমির ধান কর্তন করা হয়েছে। তবে হাওরে জলাবদ্ধতা ও শ্রমিক সংকট রয়েছে।
সব মিলিয়ে, বাম্পার ফলনের সম্ভাবনা থাকলেও প্রকৃতি ও বাজার পরিস্থিতির চাপে সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলের কৃষকরা এখন চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। সময়মতো ধান ঘরে তুলতে না পারলে এই সোনালি স্বপ্নই পরিণত হতে পারে দুঃস্বপ্নে।




