সড়কে জনশক্তির ক্ষয়!
প্রকাশিত হয়েছে : ১৬ জুলাই ২০২৪, ১২:৩৫:৫০ অপরাহ্ন

সম্প্রতি মিডিয়ায় ‘৫ বছরে ৬ হাজার শিক্ষার্থীর মৃত্যু, শীর্ষক একটি প্রতিবেদন দৈনিক জালালাবাদে প্রকাশিত হয়েছে। এতে সড়ক দুর্ঘটনায় হতাহতের এক ভয়াল চিত্র ফুটে ওঠেছে। বলা হয়েছে, গত ৫ বছরে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ গেছে ৫ হাজার ৯১৬ শিক্ষার্থীর। এই সময়ে প্রতিদিন গড়ে ৩ জন শিক্ষার্থী নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে প্রায় অর্ধেকই মারা গেছেন মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায়। প্রতিবেদনটি প্রকাশ করেছে রোড সেইফটি ফাউন্ডেশন।
প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২০১৬ সাল থেকে শুরু করে চলতি বছরের জুন মাস পর্যন্ত দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় মোট ৩৪ হাজার ৪৭০ জন নিহত হন। এর মধ্যে ১৬ শতাংশের বেশি শিক্ষার্থী। প্রতিবেদন অনুসারে, ৫ থেকে ১৭ বছর বয়সী স্কুল ও মাদরাসার শিক্ষার্থী নিহত হয়েছে ২ হাজার ৬৪১ জন। আর ১৮ থেকে ২৫ বছর বয়সী কলেজ বিশ^বিদ্যালয় শিক্ষার্থী নিহত হয়েছেন ২ হাজার ৯৭৮ জন। প্রতিবেদনে আরো দেখা গেছে, মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় প্রাণহানির সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। এ সময়ে মোটরসাইকেলের চালক ও আরোহী হিসেবে নিহত হয়েছেন ২ হাজার ৭৮৩ জন শিক্ষার্থী, যা দুর্ঘটনায় নিহত মোট শিক্ষার্থীর এটি প্রায় অর্ধেক। আর শিক্ষার্থীরা পথচারী হিসেবে যানবাহনের চাপা বা ধাক্কায় নিহত হয়েছেন ১ হাজার ৫৩৪ জন। আবার বাইসাইকেল আরোহী হিসেবে নিহত হয়েছেন ৪৯৭ জন। আর যানবাহনের যাত্রী হিসেবে নিহত হয়েচেন ৭২১ জন। আরেকটি লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে, অটোরিকশার চাকায় ওড়না বা পোশাক পেঁচিয়ে মৃত্যু হয়েছে ৮৪ জনের। দেখা গেছে, ৫ থেকে ১২ বছয় বয়সী শিক্ষার্থী স্কুলে যাওয়া আসার পথে, বাড়ির আশেপাশে খেলার সময় অটোরিকশার ধাক্কায়, বাইকে ধাক্কায়, পণ্যবাহী যানবাহনের ধাক্কায় বা চাপায় নিহত হয়েছে, এসব দুর্ঘটনা গ্রামীণ সড়কে বেশি ঘটেছে।
গবেষণায় সড়কে শিক্ষার্থী নিহত হওয়ার অন্যতম কিছু কারণ উপস্থাপন করা হয়েছে। এগুলো হচ্ছে, ত্রুটিপূর্ণ সড়ক ও অনিরাপদ যানবাহন, নিরাপদে সড়ক ব্যবহার বিষয়ে জ্ঞানের অভাব, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সড়ক নিরাপত্তা বিষয়ে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা না থাকা। বলা বাহুল্য, দেশে সড়ক দুর্ঘটনা দিন দিন আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পেলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তথা ক্ষমতাসীন মহল এ ব্যাপারে বলা যায় নির্বিকার ও উদাসীন। বিশেষজ্ঞরা ও মিডিয়াসহ সচেতন মহলে সড়ক দুর্ঘটনা রোধে সড়ক পরিবহন খাতে একটি দীর্ঘমেয়াদী সমন্বিত টেকসই পরিবহন কৌশল বাস্তবায়নের দাবি জানিয়ে আসছেন দীর্ঘদিন যাবৎ। তাদের মতে, দেশের নৈরাজ্যকর সড়ক পরিবহন খাতে বিদ্যমান শৃংখলা প্রতিষ্ঠায় এর কোন বিকল্প নেই।
বলা বাহুল্য, সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ব্যক্তিদের বেশির ভাগই কর্মজীবি বা কর্মক্ষম মানুষ। আর এদের মধ্যে একটি বড়ো অংশ হচ্ছে শিক্ষার্থী শিশু কিশোর ও তরুণ-যুবা, যারা আগামী দিনের দেশ গড়ার কারিগর। কিন্তু দেখা যাচ্ছে তাদের একটি অংশ ঝরে যাচ্ছে নিষ্করুণ সড়কে অত্যন্ত অপ্রতাশিতভাবে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে মোটরসাইকেল ও বাইক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারাচ্ছে তারা। সাম্প্রতিককালে মোটরসাইকেলের পাশাপাশি বাইসাইকেলের সংখ্যা ও বেড়েছে সড়কে। কিন্তু এগুলোর জন্য কোন আলাদা লেইন না থাকায় অন্যান্য যানবাহনের ধাক্কায় বা চাপায় এগুলোর আরোহীরা মর্মান্তিকভাবে হতাহত হচ্ছে। রোড সেইফটি ফাউন্ডেশনের অপর এক গবেষণায় দেখা গেছে, গত ৫ বছরে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার হার বেড়েছে ১৬ শতাংশ। আর এতে দুর্ঘটনায় মৃত্যুর হার বেড়েছে ৫৪ দশমিক ৮১ শতাংশ। ২০২৩ সালে মোট ৬ হাজার ৯১১টি সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হন ৬ হাজার ৫২৪ জন। আর এদের একটি বড়ো অংশ নিহত হয়েছেন মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায়। সচেতন মহলের মতে সড়কে এভাবে শিক্ষার্থীদের মৃত্যু শুধু ব্যক্তি বা পরিবার নয়, দেশের অর্থনীতির জন্য এক বড়ো বিপর্যয়। গড়ে এসব শিক্ষার্থীর ৪০ বছরের কর্মজীবন পড়েছিলো সামনে। ফলে বিপুল পরিমান ক্ষতি হচ্ছে পরিবার ও রাষ্ট্রের।
বলা বাহুল্য, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিশেষভাবে এশিয়ার জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া এবং ইউরোপের বিভিন্ন দেশ যখন তরুণ যুবাদের অভাবে হাহাকার করছে, কর্মক্ষম জনশক্তির অভাবে দেশে উৎপাদনে বিঘ্ন ঘটছে, তখন বাংলাদেশে পীচঢালা পথে ঝরে যাচ্ছে হাজার হাজার কর্মক্ষম মানুষ বিশেষভাবে তরুণ যুবা শিক্ষার্থীদের মূল্যবান জীবন। এর চেয়ে দুভার্গ্য জনক ব্যাপার আর কি হতে পারে! অথচ এই ঝরে যাওয়া জনশক্তি দেশের ও বিদেশে মূল্যবান সম্পদ হতে পারতো। হতে পারতো দেশের জন্য মহামূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জনের উৎস। ক্ষমতাশীন মহলের অবিলম্বে বিষয়টি নিয়ে ভাবা দরকার।




