টাকা নিয়ে কাড়াকাড়ি
প্রকাশিত হয়েছে : ০২ আগস্ট ২০২৪, ১২:৩০:৪১ অপরাহ্ন

সম্প্রতি পলিসি রিসার্চ ইন্সটিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর বলেছেন, দেশের ব্যাংকিং খাতকে আমরা ঘুণে ধরিয়ে দিয়েছি। টাকা ছাপিয়ে অচল ব্যাংক সচল রাখা হচ্ছে। এতে কেবল সাধারণ মানুষের ক্ষতি হয়েছে এমন না। সরকারেরও ধার নেয়ার সক্ষমতা কমেছে। তিনি আরো বলেন, ধার করে রিজার্ভ বাড়ানো যাবে। তবে এটা সমস্যার কোন স্থায়ী সমাধান নয়। রপ্তানি খাতের ডাটা নিয়ে এখন কথা হচ্ছে। তবে যদি বলা হয়, কোন খাতের ডাটায় সবচেয়ে বেশি বিভ্রান্তি, সেটা হচ্ছে ব্যাংক খাত। ব্যাংক খাতে খেলাপী ঋণ ১১ শতাংশ বলা হলেও আসলে তা ২৪-২৫ শতাংশ। এ খাতের সব ধরনের তথ্যে বিভ্রান্তি আছে। এটা কার্পেটের নিচে ময়লা রেখে পরিস্থিতি ভালো দেখানোর মতো। তবে ময়লা যেহেতু আছে দুর্গন্ধ ছড়াবেই।
ক’দিন আগে বাংলাদেশ ব্যাংক অন্যান্য ব্যাংককে ২৫ হাজার কোটি টাকা ধার দেয়ার কথা প্রকাশিত হয়েছে। ব্যাংকে তারল্য সংকট চলছে। এজন্য বিশেষভাবে দায়ী ব্যাংক ব্যবস্থাপনার ওপর গ্রাহকদের আস্থাহীনতা। ফলে গত বছর ব্যাংকগুলোতে আমানতের পরিমাণ প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকা কমে যায়। কোন কোন ব্যাংক তারল্য সংকট মোকাবেলায় অন্য ব্যাংক থেকে টাকা ধার নেয়। অর্থনীতিবিদদের মতে, খেলাপী ঋণের জন্য দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে না, যা তারল্য সৃষ্টির জন্য বিশেষভাবে দায়ী। এ অবস্থায় জনগণের আস্থা কমে যাচ্ছে ব্যাংক ব্যবস্থাপনার ওপর। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আমানতের সুদ হার বাড়ানো হয়েছে। কিন্তু এতেও কাজ হচ্ছে না। আকর্ষণীয় সুদ হার সত্বেও ব্যাংকে টাকা রাখা কমিয়ে দিয়েছেন দেশের মানুষ। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত মে পর্যন্ত এক বছরে ব্যাংক খাতের আমানত ৮ দশমিক ৭৭ শতাংশ বেড়ে ১৭ লাখ ৬০৮ কোটি টাকা হয়েছে। সাম্প্রতিক কোন বছরে এত কম প্রবৃদ্ধি হয়নি। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, মানুষ নগদ টাকা ব্যাংকে না রেখে হাতেই রাখছেন বেশী। এতে করে ব্যাংকে তারল্য সংকট আরো বেড়েছে। এই তারল্য সংকটের কারণে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর মধ্যে আন্তঃব্যাংক ঋণের পরিমাণ বাড়ছে। পাশাপাশি সংকট মোকাবেলায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকেও ঋণ করতে হচ্ছে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে। ব্যাংকটির তথ্য অনুযায়ী, গত বছর ডিসেম্বর মাসের শেষে মানুষের হাতে থাকা তথা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বাইরে প্রচলনে থাকা টাকার পরিমাণ ছিল ২ লাখ ৭৭ হাজার ৮শ ৭ কোটি টাকা। ৬ মাসের ব্যবধানে অর্থাৎ গত জুন মাসের শেষে গ্রাহকদের হাতে থাকা টাকার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ২১ হাজার ১৯৯ কোটি টাকা। ৬ মাসে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বাইরে থাকা টাকার পরিমাণ বেড়েছে ৪৩ হাজার ৩৯২ কোটি টাকা।
বলা বাহুল্য, ব্যাংক খাতের ব্যবস্থাপনা নিয়ে জনগণের মাঝে যে মারাত্মক আস্থাহীনতা সৃষ্টি হয়েছে, তার ফলে অনেকেই ব্যাংক থেকে টাকা তুলে নিচ্ছেন। প্রবাসী ও প্রবাসী পরিবারগুলো দেশের ব্যাংকগুলোতে টাকা রাখতে নিরুৎসাহিত হচ্ছেন। সাম্প্রতিক কোটা আন্দোলন থেকে সৃষ্ট পরিস্থিতি এই প্রবণতাকে আরো বৃদ্ধি করেছে। অনেক গ্রাহক ব্যাংক থেকে একটু বড় অংকের টাকা তুলতে গিয়ে যখন সাথে সাথে টাকা পাচ্ছেন না, তখন তাদের মধ্যে আতংক ও আস্থাহীনতা সৃষ্টি হচ্ছে। এ নিয়ে বিভিন্ন ব্যাংক শাখায় গ্রাহকদের তুমুল হৈ চৈ এর খবর প্রায়ই মিডিয়ায় প্রকাশিত হচ্ছে। অতি সম্প্রতি প্রবাসীদের মাঝে রেমিট্যান্স শাটডাউন নামক আন্দোলন দানা বাঁধতে দেখা যাচ্ছে। এর মারাত্মক প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা যাচ্ছে সাম্প্রতিক রেমিট্যান্সের পরিসংখ্যানে।
অনেকের মতে, গত এক মাসে রেমিট্যান্স কমেছে এক বিলিয়ন ডলারের মতো। যদি তথ্যটি সত্য হয়ে থাকে, তবে তা ভয়াবহ। এ অবস্থা চলতে থাকলে অর্থাৎ প্রবাসীরা রেমিট্যান্স পাঠানো হ্রাস বা বন্ধ করলে রিজার্ভের অবস্থা যে কোন পর্যায়ে গিয়ে দাঁড়াবে তা ভাবতেও শংকা হচ্ছে। এ অবস্থায় প্রতি ডলারের দাম ৬ টাকা বেড়েছে। আগামী দিনগুলোতে তা আরো বাড়তে পারে। এতে দেশে মূল্যস্ফীতি বাড়বে। বাড়বে জনদুর্ভোগ, আর্থিক সংকট। ব্যাংকের টাকা নিয়ে ব্যাংক ও গ্রাহকদের মাঝে কাড়াকাড়ি আরো বাড়বে। এসব সমস্যা সমাধানে অর্থনীতিবিদগণসহ সচেতন ও অভিজ্ঞ মহল জোর দিচ্ছেন সমস্যার রাজনৈতিক সমাধানের ওপর। তাদের মতে, রাজনৈতিক সদিচ্ছা ছাড়া এসব সমস্যার সমাধান অসম্ভব। আমরাও তা-ই মনে করি এবং এদিকে ক্ষমতাসীন মহলের দৃষ্টি ও মনোযোগ আকর্ষণ করছি।




