বজ্রপাত না অভিসম্পাত!
প্রকাশিত হয়েছে : ০৭ অক্টোবর ২০২৪, ১২:৩৫:৫৭ অপরাহ্ন

এক পরিসংখ্যানে জানা গেছে, দেশে চলতি বছরের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বজ্রপাতে মোট ২৯৭ জনের প্রাণহানি ঘটে এবং ৭৩ জন জন আহত হন। এ এক ভয়াবহ তথ্য জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, প্রতি বছর বাংলাদেশে সাড়ে ৩শ’ মানুষ মারা যায় বজ্রপাতে। মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশ বজ্রপাতের অন্যতম হটস্পট। আর সবচেয়ে বেশি বজ্রপাত হয় সিলেট বিভাগে।
সাধারণ এপ্রিল-মে মাসে বা বলা যায় বৈশাখে ঘটে বজ্রপাত। তবে ইদানিং বছরের যে কোন সময়ই খারাপ আবহাওয়া থাকলে বজ্রপাতের ঘটনা ঘটতে দেখা যায়। গত আগস্ট থেকে অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত বজ্রপাতে অনেক লোকের মৃত্যু হয়েছে বাংলাদেশে। ‘বিনা মেঘে বজ্রপাত’ বলে একটি প্রবাদ প্রচলিত আছে এদেশে। দেখা গেছে, অঝোরধারায় বৃষ্টি কিংবা খুব খারাপ আবহাওয়া না থাকা সত্বেও একটু মেঘলা আবহাওয়ায়ও আজকাল বজ্রপাত হচ্ছে। বিষয়টি বাংলাদেশের জনগণকে শংকিত করে তুলেছে।
বজ্রপাত নিয়ে অনেক কিচ্ছা ও পৌরানিক কাহিনী প্রচলিত থাকলেও এই প্রাকৃতিক ঘটনার নেপথ্যে বৈজ্ঞানিক সত্য লুকিয়ে আছে। সৌরবশ্মি পানিতে পড়লে পানি বাষ্পীভূত হয়ে ওপরে ওঠে যায়। এই জলীয় বাষ্প ঘনীভূত হয়ে মেঘে পরিণত হওয়ার সময় এতে প্রচুর বৈদ্যুতিক চার্জ জমা হয়। পানি চক্রের পানি কণা ক্রমে ওপরে উঠতে শুরু করে। এক সময় মেঘে থাকা পানি কণার সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। ফলে ওপরে ওঠতে থাকা বাষ্পের পরমাণু কিছু ইলেক্ট্রন হারায়। যে পরমাণু ইলেক্ট্রন হারায়, সে পরমাণু ধনাত্মক চার্জে চার্জিত হয়। আর যে পরমাণু ইলেক্ট্রন গ্রহণ করে, সেটি চার্জিত হয় ঋণাত্মক চার্জে। এতে মেঘের মধ্যে স্থির চার্জ তৈরি হয়। আর চার্জ স্থির থাকলে তৈরি হয় স্থির বিদ্যুৎ। এই স্থির বিদ্যুৎ পরিবহনের কোন মাধ্যম থাকে না। ফলে ধনাত্মক ও ঋণাত্মক চার্জ মিলিত হয়ে নিউট্রাল বা নিরপেক্ষ হতে চেষ্টা করে। তখন সৃষ্টি হয় বজ্রপাত। পৃথিবীতে যতো বজ্রপাত হয়, তার এক তৃতীয়াংশ হয় মেঘ থেকে মাটিতে। অর্থাৎ প্রতি ৪টি বজ্রপাতের মধ্যে একটি মাটিতে আঘাত করে। বাকি ৩টি’ই মেঘের ভেতরে বা এক মেঘ হতে অন্য মেঘে। পৃথিবীতে প্রতি সেকেন্ডে কোথাও না কোথাও ১০০ বজ্রপাত হয়। ফলে বজ্রপাতে মৃত্যুর হাত হতে বাঁচাও একটু ধ্বনিই বটে। তবে সতর্ক থাকলে মৃত্যুহার কমানো যায়।
বজ্রপাত থেকে বাঁচতে কিছু সতর্কতা অবলম্বন করার পরামর্শ দেন বিশেষজ্ঞরা। যেমন, বজ্রপাতের সময় খোলা মাঠে বা উন্মুক্ত স্থানে দাঁড়ানো কিংবা গাছের নিচেও আশ্রয় নেয়া উচিত নয়। কারণ খোলা স্থানেও গাছের ওপরে বজ্রপাত বেশি হয়। বজ্রপাতের সময় বিল্ডিংয়ে থাকা ভালো। পানির কাছে থাকা উচিত নয়। কারণ পানি বিদ্যুৎ সুপরিবাহী। মোটরসাইকেলে থাকলে দ্রুত নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নিতে হবে। বজ্রপাতের সময় মোবাইল ফোন ব্যবহারে সমস্যা নেই। তবে ল্যা-ফোন বিপজ্জনক। কারণ এটি তার দিয়ে যুক্ত থাকে। বজ্রপাতের সময় বাড়ির সব ইলেকট্রনিক জিনিস টিভি, ফ্যান, ফ্রিজ, এসি ইত্যাদির প্লাগ খুলে রাখতে হবে। ফাঁকা মাঠে থাকলে দুই হাত দিয়ে মাথা চেপে ধরে বসে পড়তে হবে, তবে শুয়ে পড়া যাবে না। গাড়িতে থাকলে জানালা বন্ধ করে দিতে হবে। গাড়ির ধাতব পদার্থগুলো বিদ্যুৎ সুপরিবাহী। ফলে গাড়িতে বজ্রপাত হলে গাড়ির ধাতব পদার্থের মধ্যে দিয়ে মেঘ থেকে আসা ইলেক্ট্রন মাটিতে চলে যায়। তাই গাড়িতে বসে গাড়ির ধাতব পদার্থ স্পর্শ করা উচিত নয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বজ্রপাতের হটস্পটগুলো চিহ্নিত করে বজ্র নিরোধক দ- ও যন্ত্র বসানো গেলে ১০০ মিটার ব্যাসের মধ্যে নিরাপদ থাকা সম্ভব। বজ্রপাতের ঘটনা বেশি ঘটে এমন সব জেলা বা এলাকায় বজ্রনিরোধক দ- বসানোর উদ্যোগ নেয় সরকার ২০২১-২০২২ সালে। এ জন্য দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয় সাড়ে ১৯ কোটি টাকা বরাদ্দও দেয়। কিন্তু এ উদ্যোগ কতটুকু বাস্তবায়িত হয়েছে কিংবা সফল হয়েছে, এ নিয়ে নানা প্রশ্ন রয়েছে। আমরা আশা করি বর্তমান সরকার বিষয়টি গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করবেন। কারণ বজ্রপাতে এতো বিপুল সংখ্যক মানুষের প্রাণহানি ও আহত হওয়ার বিষয়টি মেনে নেয়ার মতো নয়। বিষয়টি জাতীয় দুর্যোগ থেকে জাতীয় অভিসম্পাত হয়ে ওঠতে দেখা যাচ্ছে।





