সড়কে হরিলুট!
প্রকাশিত হয়েছে : ১৪ অক্টোবর ২০২৪, ১২:৩০:৩৩ অপরাহ্ন

সম্প্রতি মিডিয়ায় ‘১৪ বছরে সড়কে ৫১ হাজার কোটি টাকার দুর্নীতি’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, টিআইবি’র এক গবেষণায় দেখা গেছে, ২০০৯-১০ থেকে ২০২৩-২৪ অর্থ বছরে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের অধীনে বাস্তবায়িত উন্নয়ন প্রকল্পের প্রাক্কালিত দুর্নীতির পরিমাণ ২৯ হাজার ২৩০ কোটি থেকে ৫০ হাজার ৮৩৫ কোটি টাকা। উন্নয়ন প্রকল্পের নির্মাণ কাজে সার্বিক দুর্নীতির হার ২৩-৪০ শতাংশ। এর মধ্যে নির্মাণ কাজের কার্যাদেশ প্রাপ্তি ও ঠিকাদারের বিল প্রাপ্তির ক্ষেত্রে ঘুষ দুর্নীতির হার ১১-১৪ শতাংশ ও নির্মাণ কাজে রাজনীতিবিদ, ঠিকাদার ও উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের ত্রিপক্ষীয় আঁতাতের মাধ্যমে দুর্নীতির হার ১০-২০ শতাংশ। দরপত্রের লাইসেন্স ভাড়া, কার্যাদেশ বিক্রয়, সমঝোতা, স্থানীয় পর্যায়ের দুর্নীতির হার ২-৬ শতাংশ।
এ প্রসঙ্গে টিআইবি’র পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, অনিয়ম দুর্নীতির কারণে একদিকে অতিউচ্চ ব্যয়ে সড়ক উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে, অন্য দিকে নির্মিত সড়ক ও সেতুর মান খারাপ হচ্ছে, যা প্রকল্পের কাক্সিক্ষত উদ্দেশ্য অর্জনকে ব্যাহত করছে এবং জাতীয় সম্পদের বিপুল পরিমাণ অপব্যবহার ও অপচয় হচ্ছে।
জানা গেছে, দরপত্র প্রক্রিয়ার ক্রটির কারণে সড়ক ও জনপদ (সওজ) অধিদপ্তরের সড়ক ও মহাসড়ক উন্নয়ন প্রকল্পে বড়ো দুর্নীতির ঘটনা ঘটছে। পদ্ধতিগত ত্রুটির সুযোগে রাজনীতিক, আমলা ও ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট হাজার হাজার কোটি টাকা লোপাট করে নিয়েছে বিগত বছরগুলোতে। ফলে বাংলাদেশের সড়ক নির্মাণ ব্যয় প্রতিবেশী দেশগুলোর চেয়ে ২ গুণ থেকে ৯ গুণ বেশী। আর ইউরোপের চেয়ে ২ গুণ বেশী। খোদ বিশ^ব্যাংক এমন চিত্র তুলে ধরেছে।
তাদের মতে, প্রকল্পের প্রাক্কালন প্রণয়ন থেকে শুরু হয় দুর্নীতি। যেনতেন প্রাক্কলন করে ধাপে ধাপে ব্যয় ও মেয়াদ বৃদ্ধি করা হয়। এখানে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে রাজনীতিক ও আমলাদের যোগসাজশে বড় লেনদেন হয়। এছাড়া বেশী কাজ করলে দরপত্র মূল্যায়নে বেশী নম্বর দেওয়ার পদ্ধতির কারণে একই ঠিকাদার বেশী কাজ পান। ওই ঠিকাদারের লাইসেন্সে দরপত্রে অংশ নিলে অন্যরা কাজ পান না। আরো দেখা গেছে, সরকার যাদের কাজ দিতে চায়, তাদের বলে দেয়। গোপন দর ফাঁস করে দেয়। টিআইবি’র গবেষণায় আরো দেখা গেছে, বিগত ১৫ বছরের আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তরের আওতাধীন প্রকল্প বাস্তবায়নে সর্বোচ্চ ৪০ শতাংশ অর্থ লোপাটের ঘটনা ঘটেছে। তিন শ্রেণীর সমন্বিত একটি চক্র এসব অর্থ লোপাট করেছে। এর মধ্যে আছেন মন্ত্রী, সংসদ সদস্য ও প্রভাবশালী রাজনীতিক আমলা ও ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান।
দুর্ভাগ্যের বিষয়, বিগত বছরগুলোতে একের পর এক সড়ক সেতুসহ বড়ো বড়ো প্রকল্প গ্রহণ করতে দেখা গেছ সরকারকে, যখন দেশে তীব্র বেকারত্ব ও ক্ষুদ্র বাণিজ্যে চরম সংকট ছিলো বিদ্যমান। উৎপাদনশীল খাতে বরাদ্দ ছিলো না বললেই চলে। ফলে গত ১৫ বছরে দেশে উল্লেখযোগ্য শিল্প কারখানা গড়ে ওঠেনি। ক্ষুদ্র মাঝারি শিল্প বিকশিত হয়নি। হয়নি দেশী-বিদেশী বিনিয়োগ। ফলে কর্মসংস্থানের কোন ব্যবস্থা হয়নি। এতে বেড়েছে বেকারত্ব।
ব্যাংক ঋণসহ সরকারী সুযোগ সুবিধার অভাবে হাজার হাজার ক্ষুদ্র ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে। শিক্ষিত ও অশিক্ষিত বেকারে ভরে গেছে দেশ। অপরদিকে দেশের অর্থের সিংহভাগ ব্যয় হয়েছে সড়ক সেতু ও টানেল নির্মাণে, যার অধিকাংশই অনুৎপাদনশীল, এমনকি ইতোমধ্যে লোকসান দাতা হিসেবে পরিণত হয়েছে। এর পাশাপাশি সড়ক ও সেতুতে নিম্ন মানের উপাদান ব্যবহৃত হওয়ায় এবং দুর্বল মানের কাজ হওয়ায় সামান্য ঝড়বৃষ্টি, বন্যায় এগুলো নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। আগামীতে বহু সেতু এবাবে ধসে পড়ার আশংকা রয়েছে। এ সবের মূলে রয়েছে ক্ষমতাসীন মহল ও তাদের সহযোগীদের সীমাহীন দুর্নীতি ও লুটপাট।
বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে এ ধরণের দুর্নীতি ও অনিয়ম বন্ধে অবিলম্বে কঠোর কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে, এমন প্রত্যাশা ও পরামর্শ সচেতন মহলের।




