নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ প্রসঙ্গে
প্রকাশিত হয়েছে : ২৫ অক্টোবর ২০২৪, ১২:৩০:১৯ অপরাহ্ন

সম্প্রতি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা মোঃ নাহিদ ইসলাম একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছেন। আওয়ামী লীগ যে প্রক্রিয়ায় রাজনীতি করেছে, তাতে আর কখনোই রাজনীতিতে ফিরে আসতে পারবে না। তিনি আরো বলেন, যদি আওয়ামী লীগ আবার ক্ষমতায় আসে, তা গণঅভ্যুত্থানের শহীদদের সাথে প্রতারণার শামিল হবে। অবশ্যই আমাদের জীবন থাকতে তা হতে দেব না। নাহিদ বলেন, শেখ হাসিনা নিয়মতান্ত্রিকভাবে পদত্যাগ করেননি, এটা আমাদের সবার কাছে স্পষ্ট। তার পতন হয়েছে, তাকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়েছে। তাকে ক্ষমতাচ্যুত করেছে বাংলাদেশের ছাত্র-জনতা। যে দলকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়েছে, সেই আওয়ামী লীগের রাজনীতি করার অধিকার থাকবে কি-না, এ নিয়ে কোন দ্বিধার অবকাশ নেই।
সরকারের তথ্য উপদেষ্টা ও অত্যন্ত প্রভাবশালী ব্যক্তি নাহিদের উপরোক্ত বক্তব্য থেকে আওয়ামী লীগের প্রতি বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মনোভাব ও দৃষ্টিভঙ্গী প্রকাশিত হয়েছে। আর আওয়ামী লীগের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য, ঘনিষ্ঠ ও বিশ্বস্ত অঙ্গ সংগঠন ছাত্রলীগকে সম্প্রতি রাষ্ট্রীয়ভাবে নিষিদ্ধ করার মধ্য দিয়ে এই দল এবং এই দলের অঙ্গ সংগঠনগুলোর বিষয়ে সরকারের সিদ্ধান্তের বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠেছে।
লক্ষণীয় যে, ১৯৪৭ সালের ৪ জানুয়ারী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগ প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রতিষ্ঠার পর থেকে সংগঠনটি ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধসহ দেশের বিভিন্ন ঐতিহাসিক আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা লাভের পর বিশেষভাবে ১৯৯০ এর দশকের পর বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সংগঠনটিকে তাদের অঘোষিত ‘লাঠিয়াল বাহিনী’ হিসেবে ব্যবহার করতে শুরু করে। হত্যা, নির্যাতন, গণরুম কেন্দ্রীক নিপীড়ন, ছাত্রাবাসে সীট বাণিজ্য, টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি, ধর্ষণ ও যৌন নিপীড়নসহ নানা ধরনের শত সহস্র জননিরাপত্তা বিঘœকারী কর্মকান্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে এক সময়ের এই জনপ্রিয় ও ঐতিহ্যবাহী সংগঠনটির বিরুদ্ধে। শেখ হাসিনার গত দেড় দশকের শাসনামলে ছাত্রলীগ শব্দটি সন্ত্রাস ও অপরাধের সমার্থকে পরিণত হয় তাদের জঘন্য অপরাধ ও অপকর্মের কারণে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও পরে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানকালে সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীদের বিরুদ্ধে ছাত্রলীগের নৃশংস আচরণ ও হত্যাকান্ড দলটিকে রক্তপিপাসু ও নিষ্ঠুর একটি ছাত্র সংগঠনে, বলা যায় সন্ত্রাসী ছাত্র সংগঠনে পরিণত করে। যার মূল কাজ হয়ে দাঁড়ায় তাদের মাদার সংগঠন আওয়ামী লীগের লেজুড়বৃত্তি, তাদের মার্সেনারি অর্থাৎ ভাড়াটে গুন্ডাবাহিনীর দায়িত্ব পালন।
ছাত্র সংগঠনগুলোর কাজ হচ্ছে, দেশের সাধারণ ছাত্রদের স্বার্থ ও অধিকার রক্ষায় আন্দোলনসহ অন্যান্য কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ। কিন্তু ছাত্রলীগ স্বাধীনতার পর থেকে বিশেষভাবে গত ১৫-১৬ বছরে যা করেছে, তা শুধু তাদের নিজেদের দলীয় ও তাদের মূল সংগঠন আওয়ামী লীগের স্বার্থেই করেছে। এতে সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীদের কোন স্থান ছিল না। অর্থ ও ক্ষমতার লোভে তারা শিক্ষাঙ্গনসহ দেশের প্রায় প্রতিটি স্তরে নিজেদের থাবা বিস্তৃত করেছে। উন্নয়ন কাজ ও টেন্ডার থেকে চাঁদা ও কমিশন আদায় তাদের নিত্য নৈমিত্তিক কাজে পরিণত হয়। শেষ দিকে এসে যোগ্যতা না থাকা সত্বেও প্রায় সকল সরকারী চাকুরীর পদ তারা কুক্ষীগত করতে শুরু করে। এভাবে গোটা দেশ চলে যায় অযোগ্য, অদক্ষ ও দুর্নীতিবাজ শাসকদের কবলে। শত চেষ্টা করেও বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এই দুষ্টচক্রের হাত থেকে এখনো সম্পূর্ণ মুক্ত হতে পারেনি। এদের অপকর্ম ও অপরাধ এখনো চলছে রাষ্ট্রের বিভিন্ন স্তরে। এই জঞ্জাল অপসারণে দীর্ঘসময় যে লাগবে, এতে কোন সন্দেহ নেই।
এক সময় হিটলারের নাৎসী পার্টি এবং মুসোলিনীর ফ্যাসিজম জার্মানী ও ইতালিতে অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিল। কিন্তু তাদের ভুল নীতি ও অপরাধ অপকর্মের কারণে এগুলো এখন বিশ্বব্যাপী গালিতে পরিণত হয়েছে, পরিণত হয়েছে চরম ঘৃণার বিষয়ে। একইভাবে অতীত ঐতিহ্য ও ইতিহাস সত্বেও ছাত্রলীগও এখন নাৎসীবাদ ও ফ্যাসিজমের পরিণতি বরণ করতে চলেছে, এমন অভিমত রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের।
আগামী দিনগুলোতে অন্যায়, অপকর্ম ও বাড়াবাড়ির কারণে দেশের অন্যান্য রাজনৈতিক দলের ছাত্র সংগঠন বা অন্যান্য অঙ্গ সংগঠনগুলোকে যাতে ছাত্রলীগের মতো করুণ পরিণতি বরণ করতে না হয়, এ ব্যাপারে এখন থেকেই সচেতন ও সতর্ক থাকা উচিত, এমন মন্তব্য সচেতন ও অভিজ্ঞ মহলের।




