প্রবাসী আয়ে দীর্ঘমেয়াদে শংকা
প্রকাশিত হয়েছে : ২০ মে ২০২৬, ৮:১১:৫৪ অপরাহ্ন
গত ফেব্রুয়ারিতে যুদ্ধ শুরু হওয়ার নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে মধ্যপ্রাচ্যের শ্রম বাজারে। ক্রমশ: জটিল হচ্ছে এই পরিস্থিতি। জানা গেছে, যুদ্ধের ফলশ্রুতিতে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের প্রবাসী বাংলাদেশী শ্রমিক-কর্মীরা যেমন চাকরী হারিয়ে দেশে ফিরে আসতে বাধ্য হচ্ছেন, তেমনি আশংকাজনকভাবে কমেছে শ্রমশক্তি রপ্তানির হার।
জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) হিসাব অনুযায়ী, গত এক বছরে বাংলাদেশ থেকে প্রতি মাসে গড়ে প্রায় ৯৫ হাজার মানুষ কাজ করতে বিদেশে পাড়ি জমিয়েছেন। তাদের মধ্যে প্রায় ৮০ শতাংশই গেছেন মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে। বিশেষজ্ঞদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধ শুরুর পর জনশক্তি রপ্তানি প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে।
বলা বাহুল্য, বাংলাদেশের এক কোটি জনশক্তি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কাজ করছেন, তাদের মধ্যে বেশীর ভাগই রয়েছেন মধ্যপ্রাচ্যে। এর মধ্যে সৌদীআরবে প্রায় ২০ লাখ, সংযুক্ত আরব আমিরাতে ১০ লাখ, ওমানে ৭ লাখ, কাতারে ৪ লাখ, বাহরাইনে দেড় লাখ এবং কুয়েতে প্রায় দেড় লাখ প্রবাসী বাংলাদেশী কর্মী আছেন। ২০২৫ সালে বাংলাদেশ থেকে যে ১১ লাখ ৩২ হাজার কর্মী বিদেশে কাজে গেছেন, তাদের মধ্যেও সোয়া ৯ লাখের বেশী গেছেন পারস্য উপসাগরীয় অর্থাৎ জিসিসিভুক্ত দেশগুলোতে। বিশেষজ্ঞদের মতে, যুদ্ধের কারণে ওইসব দেশের অর্থনীতির যে ক্ষতি হয়েছে, স্বাভাবিকভাবেই এর একটি নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বাংলাদেশের জনশক্তি রপ্তানী ও প্রবাসী আয়ের ওপর। যদিও যুদ্ধের মধ্যেও গত কয়েক মাসে রেকর্ড পরিমাণ রেমিট্যান্স অর্থাৎ প্রবাসী আয় দেশে ঢুকেছে কিন্তু এর নেতিবাচক প্রভাবটা আসলে টের পাওয়া যাবে আরও পরে, দীর্ঘমেয়াদে।
সর্বশেষ গত এপ্রিলে তিনশ’ কোটি মার্কিন ডলারের বেশী রেমিট্যান্স এসেছে দেশে। দুই ঈদের আগে প্রতি বছরই বেশী রেমিট্যান্স আসে। এর মধ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়ায় প্রবাসীরা তাদের জমানো অর্থও দেশে পাঠিয়ে দিচ্ছেন। যার ফলে প্রবাসী আয়ে এখন রমরমা ভাব। কিন্তু এর পেছনে অপেক্ষা করছে প্রবাসী আয়ের ক্ষেত্রে ঘনীভূত সংকট।
সংশ্লিষ্টরা জানান, ভিসা না পাওয়া, ফ্লাইট চলাচলে বিঘ্ন ঘটাসহ নানান কারণে অসংখ্য বাংলাদেশী শ্রমিক কর্মী মধ্যপ্রাচ্যে যেতে পারছেন না। সব মিলিয়ে দেশের জনশক্তি খাত বহুমাত্রিক সংকটের দিকে ধাবিত হচ্ছে। তথ্য মতে, গত মার্চে সাড়ে ৪৪ হাজারের কিছু বেশী শ্রমিক কর্মী বিদেশে যাওয়ার ছাড়পত্র পেয়েছেন বিএমইটি থেকে। অথচ গত বছর মার্চে ওই সংখ্যা ছিলো ১ লাখ ৫ হাজার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে বিদেশে জনশক্তি পাঠানোর হার অর্ধেকেরও বেশী হ্রাস পেয়েছে।
এই সংকট মোকাবিলা করার জন্য জনশক্তি রপ্তানির বিকল্প বাজার অনুসন্ধানের প্রতি জোর দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের বক্তব্য হচ্ছে, বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের বড় অংশই আসে রেমিট্যান্স অর্থাৎ প্রবাসী আয় থেকে। কাজেই এটা ঝুঁকিমুক্ত রাখতে না পারলে অর্থনীতিও ঝুঁকিতে পড়বে। আর এই ঝুঁকি কমাতে হলে মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে জনশক্তি রপ্তানীর বিকল্প বাজার অবশ্যই খুঁজে বের করতে হবে। তাদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের সংকট সহসাই কাটবে না। আগামী কয়েক বছরের মধ্যে পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হবে বলে মনে হচ্ছে না। সরকার বলছে, জনশক্তি রপ্তানীর বিকল্প বাজার হিসেবে ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা, পূর্ব এশিয়া ও দূরপ্রাচ্যের দেশগুলোতে দক্ষ জনশক্তি রপ্তানীর পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
সত্যি বলতে কি, বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন মূলতঃ কৃষি ও রেমিট্যান্সের ওপর নির্ভরশীল। এ অবস্থায় অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি হিসেবে রেমিট্যান্সকে শক্তিশালী অবস্থানে রাখতে দক্ষ ও প্রশিক্ষিত জনশক্তি গড়ে তোলা এবং রপ্তানীর কোন বিকল্প নেই। আমরা আশা করি সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় তথা শীর্ষ মহল বিষয়টি অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সর্বাধিক গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করবেন।




