সম্পাদকীয় : জাতিকে পঙ্গু করে দেয়ার মতো দুর্নীতি!
প্রকাশিত হয়েছে : ১১ জুলাই ২০২৪, ১২:৩৫:৩৩ অপরাহ্ন

গতকাল একটি জাতীয় মিডিয়ায় ‘প্রশ্ন ফাঁসে সম্পদের পাহাড় আবেদ আলী চক্রের’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, পিএসসির সাবেক এক চেয়ারম্যানের গাড়ি চালানোর দায়িত্ব পাওয়ার পর ভাগ্যের চাকা রাতারাতি ঘুরতে থাকে আবেদ আলীর। প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তাদের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে সিন্ডিকেট গড়ে তুলেন। চক্রটি পিএসসির ৩৩ থেকে ৪৫তম বিসিএসের প্রশ্ন ফাঁস করে। এছাড়াও তারা নন-ক্যাডার পদের পরীক্ষার প্রশ্ন ও ফাঁস করে। প্রশ্নপত্র ফাঁস করে তারা কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেয় চাকরী প্রত্যাশীদের কাছ থেকে। আর এই চক্রটির প্রধান ভূমিকায় ছিলেন আবেদ আলী। বিনিময়ে তিনি এককভাবে শত কোটি টাকার মালিক হয়েছেন। প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, আবেদ আলীর অবৈধ টাকায় বড় ছেলে সৈয়দ সোহানুর রহমান সিয়াম বেপরোয়া জীবন যাপন করতেন। টাকা খরচ করে বাগিয়ে নেন একই সময়ে ছাত্রলীগের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ পদবী। যদিও পিতাপুত্রের শেষ রক্ষা হয়নি। পিএসসি’র তিনটি নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিষয়টি গণমাধ্যমে আসার পর ইতোমধ্যে আবেদ আলী ও তার ছেলে সৈয়দ সোহানুর রহমান সিয়ামসহ ১৭ জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশের সিআইডি। এদের মধ্যে ৬ জন নিজেদের দায় স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দী দিয়েছেন।
বাংলাদেশ সরকারী কর্ম কমিশন অর্থাৎ পিএসসি’র বর্তমান চেয়ারম্যান মোঃ সোহরাব হোসাইন বলেছেন, ১২ বছর ধরে অনেক পরীক্ষা হয়েছে। সেসব পরীক্ষার কথা যদি এখন ওঠে তাহলে সেগুলো নিয়ে কতটা কি হবে আমি বুঝতে পারছি না। কোন একক ব্যক্তির পক্ষে এসব প্রশ্নপত্র ফাঁস করা সম্ভব নয়, অনেক জনের সমন্বয়ে সেটা হতে পারে।
পিএসসি চেয়ারম্যানের এই বক্তব্য থেকে বুঝা যাচ্ছে যে, প্রশ্নপত্র ফাঁসের সাথে শুধু আবেদ আলী নয়, প্রতিষ্ঠানের অনেক কর্তাব্যক্তি জড়িত ছিলেন। তিনি আরো জানান, পরিপূর্ণ বিষয়টিই আমাদের তদন্তের মধ্যে আছে। আমাদের তদন্তের প্রতিবেদনে সম্পূর্ণ বিষয়টি আলাদা হচ্ছে হুবহু কোট আনকোট করে। তবে তিনি আশংকা ব্যক্ত করে বলেন, যখনই কোন পরীক্ষা হয়, তখন সেখানে কোন অনিয়ম হলে সাংবাদিকদের মাধ্যমে হোক, বা পরীক্ষার্থীদের মাধ্যমে হোক বা অন্যান্যভাবে অভিযোগ আসে। ১২ বছর আগের পরীক্ষা নিয়ে এতদিন পরে প্রমাণ কিভাবে হবে। তা সত্বেও পিএসসি বিষয়টি নিয়ে তদন্ত করছে এবং ১২ বছর আগের প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ নিয়েও তদন্ত কমিটি কাজ করবে।
জানা গেছে, সম্প্রতি বাংলাদেশ রেলওয়ের উপ-সহকারী প্রকৌশলী পদে নিয়োগ পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁসের প্রতিবাদে সরকারী কর্ম কমিশনের (পিএসসি) সামনে বিক্ষোভ করেছেন দুই শতাধিক চাকরী প্রার্থী। এ সময় তারা গত ৫ জুলাই অনুষ্ঠিত নিয়োগ পরীক্ষা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন। লক্ষণীয়, বাংলাদেশ সরকারী কর্ম কমিশন (পিএসসি) হচ্ছে প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োগের জন্য উপযুক্ত ও যোগ্যতাসম্পন্ন ব্যক্তি নির্বাচন করার ক্ষমতাপ্রাপ্ত একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠানটি প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিযুক্ত মানবসম্পদ পরিকল্পনায় উৎকর্ষ সাধনের পাশাপাশি জনপ্রশাসন ব্যবস্থাপনায় নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় ভূমিকা পালন করে। কর্ম কমিশন দেশব্যাপী প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার মাধ্যমে প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োগ লাভের উপযুক্ত ব্যক্তি নির্বাচন করে। কিন্তু গত এক যুগে এই সরকারী প্রতিষ্ঠানটির কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীরা প্রশ্নপত্র ফাঁসের মাধ্যমে কি আদৌ কোন যোগ্য প্রার্থী নির্বাচন ও নিয়োগ দান করেছেন, এমন প্রশ্নে এখন গোটা দেশে তোলপাড় চলছে। যারা এখন সরকারের বিভিন্ন বিভাগের উচ্চ পদে আসীন তারা কি আদৌ এসব পদের যোগ্য, এমন প্রশ্নও দেশের প্রতিটি সচেতন মানুষের।
অনেকের মতে, জাতিকে পঙ্গু করে দেয়ার মতো এমন ভয়াবহ ও জঘন্য দুর্নীতির ঘটনাও হয়তো শেষ পর্যন্ত ধামাচাপা পড়ে যাবে, কারণ এসবের তদন্ত বিচার ও শাস্তির দায়িত্ব এখন ঐসব কর্তা ব্যক্তিদের হাতে যাদের অনেকেই প্রশ্নপত্র ফাঁসের মাধ্যমে এমন পজিশনে এসেছেন।
দেশের প্রশাসনিক দক্ষতা, যোগ্যতা ও উৎকর্ষতার মেরুদন্ড ভেঙ্গে দেয়া উপরোক্ত দুর্নীতি ও অনিয়মের বিষয়ে উপযুক্ত তদন্ত এবং এর সাথে জড়িতদের উপযুক্ত শাস্তি হোক, এমন প্রত্যাশা ও দাবি জনগণের।




