একটি প্রশংসনীয় আইনি পদক্ষেপ
প্রকাশিত হয়েছে : ৩১ জুলাই ২০২৬, ১২:০১:১৬ অপরাহ্ন
সম্প্রতি ‘সন্তানকে সম্পত্তি দিলেও ভোগদখলে থাকবেন বাবা-মা’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে| এতে বলা হয়েছে, সন্তানকে সম্পত্তি লিখে দেওয়ার পর জীবদ্দশায় সেই সম্পত্তি ভোগদখলের অধিকার বাবা-মায়ের হাতে রাখার বিধান যুক্ত করতে ‘সম্পত্তি হস্তান্তর আইন’ সংশোধনের পরিকল্পনা করছে সরকার| সম্প্রতি আইনমন্ত্রী মিডিয়াকে এ তথ্য জানিয়েছেন|
আইনমন্ত্রী বলেন, প্রস্তাবিত এই আইনি পরিবর্তনের ফলে আদালতে দেওয়ানি বা সিভিল মামলার সংখ্যা অনেকটাই কমে আসবে| বিদ্যমান হেবা ব্যবস্থায়, বাবা-মা যদি সম্পত্তি সন্তানদের হেবা করে দেন, তবে সঙ্গে সঙ্গে তাদের হাত থেকে সেই সম্পত্তি চলে যাচ্ছে অর্থাৎ সেই সম্পত্তি চলে যাচ্ছে অর্থাৎ হাতছাড়া হয়ে যায়| ফলে তারা নিজেদের সম্পত্তির ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেন এবং পরবর্তী সময়ে সন্তানের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন| তখন ছেলেমেয়েরা যদি তাদের না দেখে, তখন তাদের কিছুই করার থাকে না| তারা হয়ে পড়েন নিতান্তই অসহায়| আইনমন্ত্রী আরো বলেন, হেবার পাশাপাশি ‘ট্রান্সফার অব প্রোপার্টি অ্যাক্ট’-এ গিফটের একটি ধারা রয়েছে, যেখানে সাধারণভাবেই হেবার বাইরে গিয়ে যে কেউ গিফট করতে পারেন| বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে ১৯৬৩ সালের পাকিস্তান সুপ্রিম কোর্টের একটি রায়ের আলোকে সম্পত্তি হস্তান্তর আইনে ‘ইউসুফ্রাক্ট রাইট’ বা জীবন¯^ত্বের বিধান যুক্ত করার চিন্তা ভাবনা করছে সরকার| প্রস্তাবিত নিয়ম অনুযায়ী, সন্তানকে সম্পত্তি গিফট বা হেবা করার পরও বাবা-মা তাদের জীবদ্দশায় সেটি ভোগ দখল করার অধিকার নিজের কাছে রেখে দিতে পারবেন| বাবা-মায়ের জীবদ্দশায় দুই পক্ষের সম্মতি ছাড়া কেউই ওই সম্পত্তি বিক্রি করতে পারবেন না, তেমনি বাবা-মা চাইলেও এককভাবে বিক্রি করতে পারবেন না| তবে বিশেষ প্রয়োজনে ছাড়ের বিধান থাকবে| যদি এমন পরিস্থিতি ˆতরী হয় যে বাবা-মায়ের চিকিৎসা দরকার এবং এই সম্পত্তি বিক্রি ছাড়া চিকিৎসা সম্ভব নয়, কিন্তু সন্তান বিক্রিতে সম্মতি দিচ্ছে না, সেক্ষেত্রে জেলা জজকে একটি ক্ষমতা দেয়া থাকবে| এমন পরিস্থিতিতে জেলা জজের কাছে আবেদন করা হলে তিনি বিষয়টি বিবেচনা করে নির্দেশ দিতে পারবেন|
বর্ণিত প্রস্তাবিত আইনটি অত্যন্ত সময়োপযোগী ও গুরুত্বপূর্ণ| বর্তমান সময়ে যৌথ পরিবার প্রথা ভেঙ্গে যাওয়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে| এর ফলে বৃদ্ধ বয়সে অনেক পিতামাতাকে যত্নহীন অসহায় অবস্থায় পড়তে দেখা যাচ্ছে| দিন যতো যাচ্ছে এ অবস্থা বা সমস্যা আরো প্রকট হচ্ছে|
দেখা যাচ্ছে, পিতামাতার জীবদ্দশায় অনেক সন্তান তাদের পিতামাতার ওপর চাপ সৃষ্টি করে লিখে দেয়ার জন্য| অনেক ক্ষেত্রে উত্তরাধিকারের মামলা মোকদ্দমা ও ঝামেলা এড়াতে এটা করতে বলা হয়| কিন্তু সম্পত্তি লিখে দেয়ার পর অনেক ক্ষেত্রে সেই সন্তানেরা তাদের পিতামাতার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, দেখাশোনা বাদ দেয়| বেশীর ভাগ ক্ষেত্রে স্ত্রীর প্ররোচনায় এটা ঘটে| এ অবস্থা থেকে অনেকটাই রেহাই দিতে পারে প্রস্তাবিত আইন| সম্পত্তিতে পিতামাতার জীবন¯^ত্ব থাকলে, এই সম্পত্তির আয় থেকে তারা যেমন নিজেদের ভরণ পোষণের জন্য অর্থ সম্পদ পাবেন, তেমনি সন্তানও পিতামাতার বিরাগভাজন হওয়া থেকে বিরত থাকবে|
বলা বাহুল্য, বাংলাদেশে যৌথ পারিবারিক ব্যবস্থা এখনো হারিয়ে যায়নি| তা সত্বেও অনেক পরিবার বিশেষভাবে উচ্চশিক্ষিত ও সুপ্রতিষ্ঠিত পরিবারের মাঝে মা-বাবাকে নিয়ে একত্রে বসবাসে মারাত্মক অনীহা দেখা যায়| অনেকে মা বাবাকে পরিবারে রাখাকে ‘আনস্মার্ট’ ও ‘আনকালচার্ড’ কাজ বলে মনে করেন| এজন্য আজকাল এমন বহু পিতামাতাকে বৃদ্ধাশ্রমে দেখা যায়, যারা সন্তানদের সম্পত্তি লিখে দিয়ে এখন নিঃ¯^| যাদের পুত্র কন্যারা উচ্চপদে চাকরী করছেন এবং আর্থিক দিক দিয়ে অত্যন্ত সচ্ছল| আশা করা যায়, প্রস্তাবিত আইন এসব হতভাগ্য পিতামাতার এ ধরনের দুর্গতি ও দুরবস্থা লাঘবে অনেকটাই সহায়ক হবে|




